তিন নদী-পদ্মা, কীর্তিনাশা ও মেঘনার বেষ্টনীতে গড়ে ওঠা ব-দ্বীপ জেলা শরীয়তপুরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ প্রতিদিনই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর জেলার রাজনীতিতে নেমেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন স্রোত।
ফরায়েজি আন্দোলনের পথিকৃৎ হাজী শরীয়তউল্লাহর নামানুসারে নামকরণ হওয়া শরীয়তপুর জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে শরীয়তপুর-১ (পালং–জাজিরা), শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া–সখিপুর) ও শরীয়তপুর-৩ (ডামুড্যা–ভেদরগঞ্জ–গোসাইরহাট)।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ভোটার ১১ লাখ ৫০ হাজার ৬০০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৩৮০ জন, নারী ৫ লাখ ৫৩ হাজার ২০৬ জন এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভোটার ১৪ জন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই তিনটি আসনেই রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়ে যায় বহুগুণ। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, মোটর শোভাযাত্রা ও পথসভায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায় সদর, নড়িয়া, জাজিরা, ডামুড্যা, সখিপুর ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাজার এলাকায় নিয়মিত সভা-সমাবেশে নির্বাচনী আবহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে শরীয়তপুরের তিনটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত শরীয়তপুরে জুলাই অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা অনেকটাই স্তিমিত। মামলার চাপে শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা এলাকা ছাড়লেও দলটির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো।
এর প্রভাব পড়েছে নির্বাচনী মাঠে। বিভিন্ন এলাকায় প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও উত্তেজনার খবর মিলছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর বাজার এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে উভয় পক্ষের ছয়জন আহত হন। পরদিন বুধবার (২৮ জানুয়ারি) এ ঘটনায় দুই পক্ষ পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে।
শরীয়তপুর-১ (পালং–জাজিরা):
সদর ও জাজিরা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর দুইবার স্বতন্ত্র প্রার্থী, একবার জাতীয় পার্টি এবং ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা আওয়ামী লীগ এ আসনের প্রতিনিধিত্ব করলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে দৃশ্যপট বদলেছে। বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ আসলাম (ধানের শীষ) এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দিন আহমেদ (রিকশা)। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৯ জন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন আটজন।
শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া–সখিপুর):
স্বাধীনতার পর এ আসনটি আটবার আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও এবারের নির্বাচনে পালাবদলের ইঙ্গিত মিলছে। বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ এবং জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। নদীভাঙন প্রতিরোধ ও অবহেলিত এলাকার উন্নয়ন এখানকার ভোটারদের প্রধান দাবি। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫২ জন এবং প্রার্থী নয়জন।
শরীয়তপুর-৩ (ডামুড্যা–গোসাইরহাট–ভেদরগঞ্জ):
তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন তারেক রহমানের সাবেক একান্ত সচিব মিয়া নুরুদ্দিন অপু। জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ আজহারুল ইসলাম। অতীতে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া প্রভাব থাকলেও এবারের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা বেশ জমে উঠেছে। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৯৯ জন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন প্রার্থী।
শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও শরীয়তপুর-২ আসনের প্রার্থী শফিকুর রহমান কিরণ বলেন,
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক রক্ত ঝরেছে। কোনো সিদ্ধান্ত বা বিতর্ক যেন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।
তিনি বলেন, মাঝে কোনো সমস্যা হলে আলোচনা করেই সমাধান সম্ভব। আমরা সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করতে চাই।
জামায়াত মনোনীত শরীয়তপুর ২ এর প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদ হোসেন বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের রাজনীতি থেকে মানুষ পরিবর্তন চায়। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ থাকলে জনগণ আমাদের পক্ষেই রায় দেবে। প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা প্রত্যাশা করছি।
সব মিলিয়ে শরীয়তপুরে নির্বাচনী পরিবেশ প্রাণবন্ত হলেও সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ভোটারদের আশা, যেই বিজয়ী হোন না কেন, জেলার দীর্ঘদিনের সমস্যা নদীভাঙন, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও উন্নয়ন ঘাটতি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। পদ্মা সেতু নির্মিত হলেও এসব সমস্যার কারণে এখনো কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না জেলার লাখো মানুষ।
এসআর