পৌষ ও মাঘ মাস এলেই যশোরের গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস ও গুড়ের মৌসুম শুরু হতো। শীতের সকালে গাছের মাথা থেকে টুপটাপ করে পড়া রস আর সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি গুড় ও পাটালির ঘ্রাণে মুখর থাকত গ্রামবাংলা। তবে এখন সেই চেনা দৃশ্য ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। খেজুর গাছ ও গাছির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় যশোরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় আজ সংকটের মুখে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারেও—বাড়ছে রস ও গুড়ের দাম।
একসময় যশোরের সীমান্তঘেঁষা কৃষিপ্রধান উপজেলা শার্শার বেনাপোল, নাভারন, বাগআঁচড়া, পুটখালি ও গোগা এলাকায় ছিল প্রচুর খেজুর গাছ। শীত এলেই এসব এলাকা খেজুরের রস, গুড় ও পাটালিতে ভরে উঠত। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো। কিন্তু ইটভাটা স্থাপন, জনবসতি বৃদ্ধি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ধীরে ধীরে কমে গেছে খেজুর গাছ ও গাছির সংখ্যা।
শার্শা উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ৭২ হাজার ২২৬টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার গাছ থেকে রস ও গুড় সংগ্রহ করছেন ৫৭৫ জন গাছি ও চাষি। তবে একসময় এই সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ।
স্থানীয় গাছি আমিরুল ইসলাম ও শামসুর রহমান জানান, খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছ থেকে বর্গা নিয়ে গাছ কাটতে হচ্ছে। উৎপাদিত রস ও গুড়ের অর্ধেক জমির মালিককে দিতে হয়। এরপর তিন মাসের মৌসুমে রস, গুড় ও পাটালি বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চলে। তাঁদের মতে, খেজুর গাছ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে, চাহিদা পূরণ হবে এবং দামও কমবে।
শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছিরা এখনো রস সংগ্রহে ব্যস্ত। তবে উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে রস ও গুড়ের সরবরাহ সীমিত। ফলে ভোক্তাদের এসব পণ্য কিনতে হচ্ছে আগের তুলনায় বেশি দামে।
স্থানীয় বাসিন্দা আরমান হোসেন ও মসিউর রহমান বলেন, আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এলে খেজুরের রস ও গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করা গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। কিন্তু এখন বেশি দাম দিয়েও এসব পণ্য কিনতে হচ্ছে। তাঁরা খেজুর গাছ বাড়াতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতাসহ সরকারি উদ্যোগ জোরদারের দাবি জানান।
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, ‘খেজুর গাছ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। পতিত জমিসহ বিভিন্ন জায়গায় খেজুর গাছ রোপণ এবং বাণিজ্যিকভাবে খেজুর চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাছি ও চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।’
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রম না নিলে ‘যশোরের যশ-খেজুরের রস’ ও গুড়ের শতবর্ষের ঐতিহ্য ভবিষ্যতে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইখা