ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটারের বাইরে তখন নীরবতা। ভেতরে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি, আর বাইরে অপেক্ষা করছে এক পরিবার, যাদের জীবনে আনন্দ আর শোক একই সঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে, এমন পরিস্থিতির মূলে একটি সড়ক দুর্ঘটনা।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারী) রাত সাড়ে ১০টার দিকে দেবীগঞ্জ পৌর শহরের এডভান্স ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জন্ম নেয় এক ছেলে শিশু। কিন্তু জন্মের আগেই সে হারিয়েছে তার বাবাকে।
নবজাতকের মা রিক্তা রানীর স্বামী সমেশ চন্দ্র বর্মন (৩৮) এর মৃত্যু হয়েছিল ঠিক একদিন আগে। রবিবার (১ ফেব্রুয়ারী) রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। সন্তানের জন্মের খবরে যাকে প্রথম ফোন করার কথা ছিল, সেই মানুষটি তখন পৃথিবীতে নেই।
সমেশ চন্দ্র বর্মন দেবীগঞ্জ উপজেলার পামুলী ইউনিয়নের কাটনহারী আরাজী এলাকার হরি কিশোর বর্মনের ছেলে। তিনি দেবীগঞ্জ পৌর শহরের মায়ের হাসি স্মার্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই দম্পতির সাত বছরের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে।
গত রবিবার রাত ৯টার দিকে কর্মস্থল শেষ করে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফেরার পথে দেবীগঞ্জ পৌরসভার পাকড়িতলা এলাকায় বোদা-দেবীগঞ্জ মহাসড়কে মদিনা কোল্ড স্টোরেজের সামনে দেবীগঞ্জ শহরমুখী একটি বালুবোঝাই ট্রাক তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে ট্রাকটি তাকে চাপা দিয়ে প্রায় ১৫ ফুট পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই আপন চন্দ্র রায় বাদী হয়ে দেবীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন।
এদিকে স্বামীর মৃত্যুর শোক বুকে নিয়েই সোমবার দিনভর ক্লিনিকে ছিলেন রিক্তা রানী। রাতে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নেয় তার ছেলে সন্তান। জন্মের মুহূর্তে শিশুটির কান্না আর পরিবারের চোখের পানি এক হয়ে যায়।
এডভান্স ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক হিমন দাস বলেন, সমেশ দা ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন মানুষ। তার মৃত্যুতে আমরা সবাই ব্যথিত। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটি কখনো বাবার মুখ দেখতে পারবে না। আমরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছি। সিজারিয়ান অপারেশনের যাবতীয় ব্যয় আমরা বহন করেছি।
সমেশের বোন কল্পনা রানী ও শোভা রানী বলেন, ভাইয়ের ছেলেটাকে কোলে নিলেই চোখের সামনে ভাইয়ের মুখ ভেসে ওঠে। কীভাবে এই শোক মেনে নেব, সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে ভাবছি, হয়তো ঈশ্বর আমাদের কপালে এমন অঘটনই লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের কথা, ভাইয়ের ছেলেটা জন্মের পর বাবার আদর পেল না।
পিএম