নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক কর্মবিরতি শেষে বুধবার সকাল থেকে আন্দোলন অনির্দিষ্টকালে রূপ নেওয়ায় বন্দরের সব ধরনের অপারেশন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দেশের আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে বন্দরের জেটিতে কোনো ধরনের কন্টেইনার ওঠানামা হয়নি। গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টাইরড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ সব যন্ত্রপাতি বন্ধ রয়েছে। জাহাজ ভেড়ানো, পণ্য খালাস, রপ্তানি কন্টেইনার লোডিং, সব কার্যক্রম থমকে গেছে। জেটিতে জায়গা খালি থাকলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে নতুন কোনো জাহাজ ভিড়তে পারছে না।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, কর্মবিরতির প্রভাবে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬টিতে। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দীর্ঘ সময় নোঙরে অপেক্ষা করায় প্রতিটি জাহাজকে বিপুল অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ওপর।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নির্ভরযোগ্য বন্দর হিসেবে দেশের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি ও রুট পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টা ধরে পণ্য ডেলিভারি বন্ধ থাকায় বন্দর এলাকার ভেতরে ও বাইরে হাজার হাজার ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেইনারবাহী যানবাহন আটকে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কর্তৃপক্ষ নতুন করে কোনো গাড়িকে বন্দরের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে চট্টগ্রাম নগরীর আশপাশের সড়কগুলোতেও ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিনের পর দিন গাড়ি আটকে থাকায় জ্বালানি, শ্রমিক মজুরি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শেষ পর্যন্ত পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ানোর আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
এনসিটি ইস্যুতে শ্রমিক-কর্মচারীদের অসন্তোষ নতুন নয়। গত শনিবার থেকে তারা টানা তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন। এতে বন্দরের কার্যক্রম আংশিকভাবে ব্যাহত হলেও কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসায় মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক কর্মবিরতি। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বুধবার সকাল থেকেই আন্দোলন অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচিতে রূপ নেয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এনসিটির মতো একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া হলে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এই অচলাবস্থায় আমদানি পণ্য খালাস ও রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণের জন্য আসা হাজার হাজার ট্রাক বন্দরে আটকে রয়েছে। আমদানিকারকরা বলছেন, কন্টেইনার খালাসে দেরি হওয়ায় তাদের প্রতিদিন অতিরিক্ত স্টোর রেন্ট, ডেমারেজ ও নানা ধরনের মাশুল গুনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্যই এই অতিরিক্ত খরচে বেড়ে যাচ্ছে।
রপ্তানিকারকরা আরও গভীর সংকটে পড়েছেন। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার বাতিল, জরিমানা এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য ও কৃষিপণ্য খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
রমজান সামনে রেখে বন্দরে আটকে পড়েছে বিপুল পরিমাণ ভোগ্যপণ্যবাহী কন্টেইনার। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই সংকট দীর্ঘ হলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যস্তরে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়করা দাবি করেছেন, শ্রমিক-কর্মচারীরা কোনো রাজনৈতিক নির্দেশনায় নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব ও দেশের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের অভিযোগ, ঢাকায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কার্যালয়ে বন্দর কর্মকর্তাদের আটকে রেখে এনসিটি ইজারা চুক্তিতে সই করানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত তারা ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে দেখছেন এবং এই সিদ্ধান্ত বাতিল না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনা করে। এই বন্দর দীর্ঘ সময় অচল থাকলে জাতীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য, রাজস্ব আদায় এবং শিল্প উৎপাদনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। দ্রুত রাজনৈতিক ও নীতিগত সমাধান না এলে সংকট আরও গভীর হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
পিএম