সবুজের ভেতর হারিয়ে যেতে কার না ইচ্ছা করে! শহরের কোলাহল, ধুলো আর ব্যস্ততার বাইরে প্রকৃতির কাছে একটু প্রশান্ত নিঃশ্বাস নিতে চাইলে ময়মনসিংহের ভালুকায় আছে এক নিভৃত আশ্রয়—কাদিগড় জাতীয় উদ্যান। প্রকৃতি আর মানুষের হাতে গড়া বনের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অরণ্য যেন সবুজের এক জীবন্ত পাঠশালা।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের অধীন ভালুকা রেঞ্জের কাদিগড় বিট আজ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। চোখজুড়ানো গজারি আর সেগুনের বাগান, ঘন সবুজের আবরণ আর পাখির অবিরাম কিচিরমিচির মুহূর্তেই মনকে টেনে নেয় প্রকৃতির গভীরে। উঁচু গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো নেমে আসে মাটির বুকে, বাতাসে পাতার মর্মর আর দূরের পাখির ডাক মিলেমিশে তৈরি করে এক মোহময় পরিবেশ।
বহু বছর আগে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা মিনজিরি, অর্জুন ও সেগুনের বাগানগুলো সময়ের প্রবাহে আজ প্রায় প্রাকৃতিক বনের রূপ নিয়েছে। প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্যে এসে এই সবুজের সমারোহ আর পাখির কলতান প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে করে তোলে বিমোহিত। কাদিগড় উদ্যানে নিয়মিত দেখা মেলে হনুমান ও বানরের দল। ভাগ্য ভালো থাকলে গাছের ডালে ডালে তাদের লাফালাফিও চোখে পড়ে। প্রাণীকূলের মধ্যে রয়েছে শিয়াল, শজারু, মেছো বিড়াল, বনবিড়াল, বাগডাশ ও বেজি। বনের ভেতরে বিচরণ করে নানা প্রজাতির সাপ, ব্যাঙ, তক্ষক ও গুইসাপ। রঙিন প্রজাপতির উড়াউড়ি আর নানা জাতের পাখির কিচিরমিচির এই বনকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
অবস্থানগত দিক থেকে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দক্ষিণে। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান থেকে এটি প্রায় ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে এবং ভালুকা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যোগাযোগ ব্যবস্থাও তুলনামূলক সহজ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে সিডস্টোর বাজারে নেমে সেখান থেকে সিএনজি যোগে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাওয়া যায় কাদিগড়ে। ভাড়া পড়তে পারে প্রায় ১৫০ টাকা। তবে বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তার কারণে চলাচলে কিছুটা ভোগান্তি হয়।
শুষ্ক মৌসুমে কাদিগড় বিট হয়ে ওঠে বনভোজনপ্রেমীদের মিলনকেন্দ্র। পরিবার, বন্ধু কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের মানুষ এখানে এসে প্রকৃতির কোলে সময় কাটান। সবুজ যে প্রাণের স্পন্দন, বেঁচে থাকার অনিবার্য অংশ—সে উপলব্ধি যেন আরও গভীর হয় কাদিগড়ের বনে এসে।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় এই জঙ্গলের কাঠ সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে কাদির মিয়া নামে এক ব্যবসায়ী কিনতেন। তাঁর একক আধিপত্যের কারণে অন্য কেউ টেন্ডারে অংশ নিতে পারতেন না। সেই দাপুটে প্রভাব থেকেই এলাকাটি পরিচিত হয় ‘কাদির মিয়ার জঙ্গল’ নামে, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে আজ কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হিসেবে পরিচিত।
প্রায় ৯৫০ একর আয়তনের এই উদ্যানে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার, দুটি ইকো কটেজ, দুটি গোলঘর, পিকনিক স্পট এবং পুকুরপাড়। পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা গেলে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য।
সবুজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে চাইলে, প্রকৃতির কাছে একটু শান্তি খুঁজতে চাইলে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হতে পারে সেই নিখুঁত ঠিকানা—যেখানে প্রকৃতি কথা বলে নীরবে।
ইখা