টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় শনিবার গভীর রাতে যখন অ্যাম্বুলেন্সটি থেমে গেল, পুরো গ্রাম যেন এক মুহূর্তে নিঃশব্দ হয়ে গেল। ২৮ দিন আগে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে যে শিশুকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল বাঁচার আশায়, সে ফিরল এবার জীবনের নয়—ফিরল সাদা কাফনে মোড়া নিথর দেহ হয়ে।
গ্রামের মানুষ অপেক্ষায় ছিল, ফিরবে আফনান। উঠোনে আবার ছুটবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে, হাসবে শিশুর মতো। কিন্তু সেই হাসি আর ফিরল না। তেচ্ছিব্রিজের আকাশ ভারী হয়ে উঠল কান্নায়।
বাড়ির উঠানে মরদেহ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে স্বজনেরা। রাতের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে শোকের শব্দ। থেমে যায় এক শৈশবের গল্প—অকালেই।
হুজাইফা আফনান (৯) শনিবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ১১ জানুয়ারি সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে মাথায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে টানা ২৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে সে।
পরিবার জানায়, ঘটনার দিন বাড়ির পাশেই খেলছিল আফনান। ঠিক তখনই সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) ও একটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। গোলাগুলির একপর্যায়ে একটি গুলি এসে লাগে শিশুটির মাথায়।
রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
শিশুটির বাবা জসিম উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছেলেকে বাঁচানোর আশা ছাড়িনি। প্রতিদিন ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছি। মনে হয়েছে, একদিন হয়তো সুস্থ হয়ে আবার দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু সেই দিন আর এলো না।”
তিনি বলেন, “তার কোনো দোষ ছিল না, কোনো শত্রুও ছিল না। সে শুধু খেলছিল।”
মায়ের আহাজারিতে বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল সন্তানের নাম। প্রতিবেশীরা জানান, আফনান ছিল সবার প্রিয়। স্কুলে যাওয়ার পথে হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলত। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলাই ছিল তার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন, “হুজাইফা শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো তেচ্ছিব্রিজ এলাকার সন্তান ছিল। সীমান্তের গুলির রেশ এসে যদি আমাদের ঘরেই প্রাণ কাড়ে, তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ?”
আরেক প্রতিবেশী ইলিয়াস হোসেন বলেন, “সীমান্তের মানুষ আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি। আজ আফনান, কাল হয়তো আরেকজন। আমরা চাই, আর কোনো পরিবারকে যেন এভাবে সন্তানের লাশ নিতে না হয়।”
গ্রামজুড়ে এখন শোকের ছায়া। জানাজা শেষে আফনানকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবার।
ছোট্ট কবরের পাশে হয়তো খেলনার জায়গা থাকবে না, কিন্তু থেকে যাবে অকালেই থেমে যাওয়া এক শৈশবের গল্প।
২৮ দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় যে শিশুটি মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছে, তার বাড়ি ফেরা হলো নীরবতায়। সীমান্তের গুলির শব্দ থেমে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের মানুষের বুকের ভেতর সেই শব্দ এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ইখা