আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে যশোরের বিভিন্ন সীমান্ত পথে ভারত থেকে আসছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে জেলায় এসব মারণাস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত দুই মাসে যশোর সীমান্তে বেশ কয়েকটি বড় অস্ত্রের চালান ধরা পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার পরিবর্তনের গত এক বছরে কেবল যশোর সীমান্ত এলাকাতেই ৬২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশ সংঘটিত হয়েছে বিদেশি পিস্তলের মাধ্যমে। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা না গেলে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্ত পথে যাতে কোনোভাবেই অস্ত্র ঢুকতে না পারে, সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
যশোরের শার্শা, চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলার ২৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ভারতের সাথে সীমান্ত বিস্তৃত। নদী, ঘন বনজঙ্গল এবং অনেক স্থানে কাঁটাতারবিহীন সীমানা হওয়ায় চোরাকারবারিদের তৎপরতা এখানে বেশি। গোয়েন্দা তথ্য ও সাম্প্রতিক অভিযানে আটক ব্যক্তিদের জবানবন্দি অনুযায়ী—চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, শাহজাদপুর, হিজলা, পুটখালি, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা এবং বেনাপোলের গোগা, কায়বা ও শিকারপুর রুট দিয়ে এসব অস্ত্র-বিস্ফোরক দেশে ঢুকছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অন্ধ্রপ্রদেশে নির্মিত অস্ত্রই বেশি আসছে। এর মধ্যে বিহারের মুঙ্গেরে তৈরি ‘কাট্টা রাইফেল’, বেলঘরিয়ার ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’, খিদিরপুরের ‘ছক্কা পিস্তল’ ও মুর্শিদাবাদের ‘ময়ূর পিস্তল’ উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমানে ৯ এমএম ও ৬.৫ এমএম পিস্তল এবং পয়েন্ট ৩৮ ও পয়েন্ট ৩২ বোরের রিভলবারের মতো আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। আকারে ছোট হওয়ায় এগুলো সহজে বহন ও লুকিয়ে রাখা যায়।
গত ৩০ জানুয়ারি বাঘারপাড়া উপজেলার দড়িআগ্রা গ্রামে অভিযান চালিয়ে ১০টি গ্রেনেড ও ৩টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করে যৌথবাহিনী। এর আগে ৩০ নভেম্বর সদর উপজেলার মধুগ্রাম থেকে ৫টি বিদেশি পিস্তল ও ৫০ রাউন্ড গুলিসহ একজনকে আটক করা হয়। গত শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) শহরের বারান্দি মোল্লাপাড়ায় সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে দুটি ইউএসএ পিস্তলসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়; এ ঘটনায় একই পরিবারের চারজনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া গত দুদিনে চৌগাছা, গাতিপাড়া ও কায়বা সীমান্ত থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বেশ কিছু পিস্তল, এয়ারগান ও গুলি উদ্ধার করেছে বিজিবি।
বেনাপোলের ভোটার ফজলুর রহমান ও আজিজুল হক জানান, সীমান্তে মাঝে মাঝে অস্ত্র ধরা পড়লেও মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্রের এই মহড়া সাধারণ মানুষের মনে ভীতি তৈরি করছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘রাইটস যশোর’-এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, “উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা জরুরি। যে পরিমাণ অস্ত্র ঢুকছে, সেই তুলনায় আটকের পরিমাণ এখনো কম।”
যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতা প্রতিরোধে সীমান্তে নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “সারাদেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্তে ৩৭ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। যেকোনো অস্ত্রের চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগেই তা রুখে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।” তিনি অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষকে বিজিবির পাশে থাকার আহ্বান জানান।
এনআই