ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ (বরগুনা সদর, তালতলী ও আমতলী) একমাত্র আসনে জয় পেয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী কেওড়াবুনিয়া দরবারের পীর মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ। পীর পরম্পরার রাজনীতি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও দলের সুসংগঠিত নেতৃত্বের সমন্বয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন তিনি।
মাওলানা অলি উল্লাহ কেওড়াবুনিয়ার মরহুম পীর সাহেব মাওলানা আব্দুর রশিদের ছেলে। বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি পীরের দায়িত্ব নেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রথম অংশ নিয়েই তিনি প্রায় ২৪ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। সেই নির্বাচন বিতর্কিত ছিল, কিন্তু ভোটের অঙ্ক তাকে রাজনীতির মানচিত্রে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেয়।
বরগুনা-১ আসনে ইসলামী ধারার রাজনীতির শিকড় আরও পুরনো। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ৪৪ হাজার ৭২২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তখন চরমোনাই পীরের জোটের ইসলামী ঐক্য জোটের মাওঃ আব্দুর রশিদ ২৯ হাজার ৫০৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। বিএনপির প্রার্থী তৃতীয় স্থানে ছিলেন। একই চিত্র দেখা যায় ১৯৯৬ সালেও। তৎকালীন সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভু তখন পান ৫৪ হাজার ৯৫৩ ভোট, আর ইসলামী ঐক্য জোটের আব্দুর রশিদ পীর সাহেব থাকেন দ্বিতীয় অবস্থানে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। ২০০১ সালে আসে ব্যতিক্রম। স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ৮৪ হাজার ৬১১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের সাংসদ শম্ভু পান ৫১ হাজার ৩০২ ভোট। ইসলামী জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের মাওঃ আব্দুর রশিদ তখন তৃতীয়, ১১ হাজার ৮৮৯ ভোট।
ভোটের ফলাফল: টানটান লড়াই
আমতলী, তালতলী ও বরগুনা সদর উপজেলা মিলিয়ে এবারের ভোটের ফল ঠিক সেই রকমই এক দীর্ঘ গল্পের নতুন অধ্যায়। আমতলীর ৬৫টি কেন্দ্রে হাতপাখা প্রতীকের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। এখানে হাতপাখা পেয়েছে ৫৫ হাজার ৪৭৫ ভোট, ধানের শীষ থেমেছে ৪১ হাজার ৩৮২ ভোটে। কিন্তু পাশ্ববর্তী উপজেলা তালতলীতে ভোটের চিত্র উল্টো। ৩০টি কেন্দ্রে ধানের শীষ এগিয়ে ছিল। সেখানে ভোট পেয়েছে ২৮ হাজার ২৬০। হাতপাখা সেখানে নেমেছে ২০ হাজার ৬৪৫ ভোটে। বরগুনা সদর উপজেলায় এসে লড়াই আরও জমে উঠেছে। ৯৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষ পেয়েছে ৬৩ হাজার ৬৯৫ ভোট আর হাতপাখা ৬২ হাজার ৩৯২ ভোট। ব্যবধান এমন, যে বারবার গুনে দেখতে হয়। সব কেন্দ্রের হিসাব যোগ করলে হাতপাখা ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫১২ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকে। ধানের শীষের ঝুলিতে পড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৬। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান মাত্র ৪ হাজার ১৭৫। এই অল্প দূরত্বেই জেলার রাজনীতিতে বড় ইঙ্গিত দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ বরগুনার ভোট বরাবরই শুধু বর্তমানের নয়, অতীতের ধারাবাহিকতায় সমন্বয়ে তৈরি। অপর দুই প্রার্থী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোঃ জাহাঙ্গীর হোসাইন ৬২৩২ ভোট পেয়েছেন এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) মনোনীত প্রার্থী পেয়েছেন ৯৮১ ভোট।
ইসলামী আন্দোলন বরগুনা জেলা কমিটির সাবেক প্রচার-সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, ' পীর সাহেব অলি উল্লাহ ২০১৮ সালে প্রায় ২৮ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তবে ২০০৮ ও ২০১৪ সালে এই আসনে তার বাবা প্রার্থী হননি। তার বাবা আব্দুর রশিদের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ের ভেতর দিয়ে বরগুনায় ভোটের রাজনীতিতে এক ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন।'
নির্বাচনের আগে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগ দেবেন জানিয়ে পীর সাহেব মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ বলেন, 'আমি নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এলাকাকে মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিমুক্ত করা। মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রধান অগ্রাধিকার। আমি কথা দিয়েছি, সেই কথা রাখাই এখন আমার প্রথম দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, 'উপকূলীয় এই জেলায় অবকাঠামোগত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা।'
এসআর