২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর থেকে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এছাড়া বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা আবার তদন্ত করা হবে বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। সেখানে ওপরের দুইটি বিষয় ছাড়াও বেশকিছু নির্দেশনা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৈঠকশেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর বেশ কিছু মামলা হয়েছে, কিছু সুবিধাবাদী মানুষ এসব মামলা করেছে। ব্যবসায়ী-সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষদের নামে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলা যাচাই-বাছাই করা হবে এ জন্য যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য এসব মামলা পুনরায় যাচাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুলিশ সরকারকে প্রতিবেদন দেবে বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগ আমলে নেয়া অস্ত্রের লাইসেন্স প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে (২০০৯ থেকে ২৪ সাল) দেয়া অস্ত্রের লাইসেন্সগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। বিগত সময়ে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে কি না, কাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তারা লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য ছিল কি না, তা দেখা হবে। যাচাই-বাছাইয়ের সময়ে যারা লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাদের অস্ত্রের লাইসেন্স বহাল থাকবে আর যাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং অপরাধের উদ্দেশ্যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, সেসব লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে ভোগান্তির অভিযোগ পুরোনো। এই ভোগান্তি নিরসনেও উদ্যোগ নিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাসপোর্ট করার পদ্ধতি অনেকে জানেনই না। এই ভোগান্তি নিরসনে সরকারের পন্থার কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে এটা চালু করা হবে। সেটি হলো দলিল লেখকদের মতো পাসপোর্টেও কিছু লোকজন থাকবে নিবন্ধিত, যারা পাসপোর্টের কাজটি করে দেবেন। এ জন্য তারা সার্ভিস চার্জ নিতে পারবেন। এতে একদিকে মানুষের কর্মসংস্থান হবে, আবার ভোগান্তি কমে আসবে।’
মব ভায়োলেন্স নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘যদি কোথাও ‘‘মব ভায়োলেন্স’’ হয়ে থাকে, তাহলে সরকার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে। মহাসড়ক বন্ধ করে দাবি আদায় করা যাবে না। কারও কোনো বৈধ দাবি থাকলে বৈধ পথে আসতে হবে।’
সোমবার একটি জাতীয় দৈনিকে রাষ্ট্রপতির দেয়া সাক্ষাৎকার বেশ ভাইরাল হয়েছে। এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকের কথা বলার অধিকার রয়েছে। যে যার মতো করে কথা বলবেন। প্রত্যেকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।’
পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ করা যাবে না হুঁশিয়ারি দিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘পুলিশের কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করলে সঙ্গে সঙ্গে সরকার ব্যবস্থা নেবে। পুলিশের কাজে অনেক সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হয়। সেটি বন্ধ করতে হবে। পুলিশের কাজেও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। মানুষের হয়রানি হয়, এমন কোনো কাজ করা যাবে না। পুলিশ এমন কোনো কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
লটারির মাধ্যমে ওসি ও এসপি পদায়ন বন্ধ করা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এতে যিনি যেখানে যোগ্য, তাকে সেখানে পদায়ন করা সম্ভব হয় না বলেও মনে করেন তিনি। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতি করে পুলিশের কনস্টেবল পদে যারা চাকরি নিয়েছেন, সেসব নিয়োগ যাচাই-বাছাই করা হবে বলেও জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এছাড়া পুলিশের সব পর্যায়ে খালি থাকা ২ হাজার ৭০১ জন কনস্টেবলের পদে দ্রুত নিয়োগ দেয়া হবে ও ২০০৬ সালে চাকরি হারানো পুলিশ সদস্যরা চাকরি ফিরে পাবেন বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অন্যদের মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী, এসবির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. গোলাম রসুল, র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব দেলোয়ার হোসেন, সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ছিবগাত উল্লাহ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার, এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওসমান সরোয়ার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল, কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান উপস্থিত ছিলেন।
এবি