একসময় ফেলে দেওয়া হতো নারিকেলের ছোবড়া। গ্রামবাংলায় এটি ছিল মূল্যহীন বর্জ্য। অথচ এখন সেই অবহেলিত নারিকেল ছোবড়াই লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হায়দারগঞ্জ বাজার এলাকার অন্তত ৮ থেকে ১০টি পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। কোনো সরকারি সহায়তা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে শ্রমনির্ভর একটি ক্ষুদ্র শিল্প, যা টিকে আছে শ্রমিকের ঘাম আর ব্যবসায়ীর ঝুঁকির ওপর।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাঁচা ও শুকনো নারিকেল সংগ্রহ করা হয় রায়পুরে। পরে শ্রমিকরা নারিকেলের ছোবড়া ছাড়িয়ে মেশিনে মাড়াই করেন। মাড়াই শেষে তা রোদে শুকিয়ে ৪০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের বেল্ট আকারে বেঁধে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
এই ছোবড়া ব্যবহার হচ্ছে জাজিম, সোফা ও চেয়ারের গদি তৈরিতে। পাশাপাশি আধুনিক কৃষিকাজে ব্যবহৃত কোকোপিট (কোকোফাইবার) উৎপাদনেও এর চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ পরিত্যক্ত একটি উপাদান এখন রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক কাঁচামালে। তবে এ শিল্পের বিকাশে নেই কোনো সরকারি নীতিমালা, প্রশিক্ষণ বা প্রণোদনা।
প্রায় ১৮ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, “মহাজন নারিকেল এনে দিলে আমরা ছোবড়া ছাড়াই, মেশিনে মাড়াই করি, শুকাই। এতে সংসার চলে। কিন্তু সারা বছর কাজ থাকে না। ছয় মাসের বেশি কাজ থাকলে আমাদের জন্য ভালো হতো।”
আরেক শ্রমিক আক্তার জানান, দিনে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার নারিকেলের ছোবড়া ছাড়াতে পারেন তিনি। এতে দৈনিক আয় হয় প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা। তবে কাজ না থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যায়।
নারী শ্রমিক নাজমা বেগম বলেন, “মেশিনে মাড়াইয়ের পর ছোবড়া আলাদা করে রোদে দিই। সকাল ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কাজ করি। দৈনিক মজুরি ৩৫০ টাকা।”
শ্রমিকদের নেই কোনো পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা দুর্ঘটনা বিমা। পুরো কার্যক্রম চলছে অনানুষ্ঠানিক কাঠামোয়।
হায়দারগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন বাচ্চু প্রায় ২৫ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, “বিভিন্ন জায়গা থেকে নারিকেলের ছোবড়া কিনে এনে মাড়াই করে শুকিয়ে বেল্ট বানিয়ে বিক্রি করি। বছরে প্রায় ছয় মাস ভালো ব্যবসা হয়। এ সময় ৭-৮ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন।”
তিনি জানান, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প আরও সম্প্রসারণ করা যেত। কিন্তু ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন, আর সরকারি দপ্তরগুলোর আগ্রহও কম।
আমির ট্রেডার্সের মালিক আমির হোসেন বলেন, “বর্তমানে কোকোপিটের চাহিদা বেড়েছে। ছাদবাগান, চারা উৎপাদন ও গাছের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এটি ব্যবহার করা হয়। আমরা ছোট পরিসরে কাজ করছি। সরকারি প্রশিক্ষণ বা রপ্তানির অনুমোদন পেলে অনেক বেশি লাভবান হতে পারতাম।”
স্থানীয়দের মতে, নারিকেল ছোবড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবেশবান্ধব এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এখনো এ খাত অপ্রাতিষ্ঠানিক অবস্থায় রয়েছে। নেই মান নিয়ন্ত্রণ বা বাজার সম্প্রসারণের সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই শিল্পে আরও বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।
পরিত্যক্ত সম্পদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শ্রমনির্ভর শিল্প রায়পুরবাসীর কাছে শুধু বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ নয়, বরং জীবন-জীবিকার আরেক নাম। এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্র এ সম্ভাবনাময় খাতকে কতটা গুরুত্ব দেয়।
ইখা