আইনের কাগজে-কলমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের সেবা। কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানা ঘিরে উঠেছে উদ্বেগজনক অভিযোগ—‘ফ্রি’ সেবার আড়ালে চলছে অর্থ আদায়ের এক নীরব বাণিজ্য!
অভিযোগকারীদের দাবি, জিডি করতে গেলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘অফিস খরচ’ বা ‘প্রসেসিং ফি’ নামে অবৈধ টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে জিডি গ্রহণে টালবাহানা, আবেদনপত্র সংশোধনের নামে হয়রানি কিংবা দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে নাগরিকদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, থানায় জিডি করার জন্য কোনো সরকারি ফি নেই—এটি পুলিশের একটি মৌলিক নাগরিক সেবা। অথচ ভুক্তভোগীরা বলছেন, “টাকা না দিলে জিডি হয় না”—এমন এক অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে পুরো প্রক্রিয়াটি।
হারানো মোবাইল, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ব্যাংকের চেকবই, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা নিরাপত্তা শঙ্কা—এসব বিষয়ে জিডি করতে গেলেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘খরচ’ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কখনো সরাসরি, আবার কখনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়—“কিছু খরচ দিলে কাজ দ্রুত হয়ে যাবে।”
রায়হান নামের এক ভুক্তভোগী জানান, “মঙ্গলবার বিকেলে আমি এনআইডি হারানোর বিষয়ে জিডি করতে থানায় যাই। ডিউটি অফিসার আমাকে ওয়্যারলেস অপারেটরের কাছে পাঠান। তিনি জিডি ‘কনফার্ম’ করতে ‘অফিস খরচ’ দাবি করেন। জিডির জন্য টাকা লাগবে শুনে আমি অবাক হয়ে যাই।”
রায়হানের মতো অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না। তাঁদের আশঙ্কা, থানায় প্রতিবাদ করলে ভবিষ্যতে আরও হয়রানির শিকার হতে হবে। ফলে অধিকাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে জিডি করে নীরবে ফিরে যাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলশিক্ষক বলেন, “অভিযোগ করলেও তো আবার সেই থানাতেই যেতে হবে। তাই ঝামেলা এড়াতে টাকা দিয়েই কাজ সেরে ফেলেছি।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, যদি এভাবে ‘জিডি বাণিজ্য’ চলতে থাকে, তবে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করবে। এতে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাবে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
আইনজীবীদের মতে, এটি শুধু দুর্নীতি নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক আইনি অধিকার ক্ষুণ্ণ করার শামিল। জিডি হলো কোনো অপরাধ বা নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রাথমিক তথ্য রাষ্ট্রকে জানানোর অন্যতম আইনি প্রক্রিয়া। সেখানে টাকা নেওয়া আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণ ডায়েরি করা একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের সেবা। কোনো পুলিশ সদস্য বা কর্মচারী জিডির জন্য অর্থ দাবি করতে পারেন না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানান, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এনআই