বরিশালে আদালতের এজলাস কক্ষে ঢুকে ভাঙচুর, বিচারককে হুমকির অভিযোগ এনে দুই পিপি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ১২ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার প্রধান আসামি বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিঙ্কনকে বুধবার দুপুরে আদালতে থাকা অবস্থায় তার কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করেন পুলিশ। পরে বিকেলে তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালতের বিচারক।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ।
মামলায় আসামিরা হলেন, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মির্জা রিয়াজুল ইসলাম, জেলা পিপি আবুল কালাম আজাদ, মহানগর পিপি নাজিমুদ্দিন পান্না, মহসিন মন্টু, মিজানুর রহমান, আব্দুল মালেক, সাইদ, হাফিজ উদ্দিন বাবলু, তারেক আল ইমরান, বসির উদ্দিন সবুজ, আবুল কালাম আজাদ ইমনসহ অজ্ঞাত ৮ জন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জামিন অযোগ্য ধারা থাকা সত্ত্বেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক দুই এমপিসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে জামিন দেওয়ার অভিযোগ এনে মঙ্গলবার আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ পরে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রটে আদালতের বিচারকের এজলাসে হট্টগোল ও চেয়ার টেবিল ওলট-পালট করেন কয়েকজন আইনজীবী । যা বুধবার মামলায় গড়ায়।
এ বিষয়ে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির কামরুল ইসলাম জানান, বিচার কাজে বাধা, এজলাসে ঢুকে হট্টগোল এবং হুমকি দেওয়ার ঘটনায় মামলাটি দায়ের হয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলোক শর্মা বলেন, ‘মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’
বরিশাল জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, গ্রেফতার ও মামলার প্রতিবাদে বরিশালে অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেবে না আইনজীবীরা। পুলিশ জানান, আদালতের এজলাসে ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে।
ঘটনার পর আদালতপাড়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এজলাসে ভাঙচুরের প্রতিবাদে বিচারকরা সাময়িকভাবে বিচার কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো আদালত এলাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
অন্যদিকে সভাপতিকে আটকের প্রতিবাদে জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা আদালত চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং আদালত বর্জনের ঘোষণা দেন।
বরিশাল জজ কোর্টের স্পেশাল পিপি হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, ‘আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আদালতে প্রবেশ করেন। এ সময় বিচারক এজলাস ত্যাগ করেন। পরে আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে আটক করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে তারা আদালত বর্জন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছি এবং আগামীকাল থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষনা করা হতে পারে।’
উল্লেখ্য, কার্যক্রম নিষিদ্ধ বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মো. ইউনুসের জামিনকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তিনি গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বরিশাল অতিরিক্ত মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান। ইউনুসের জামিনের প্রতিবাদে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) আইনজীবীরা মহানগর আদালত বর্জন করেন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকের অপসারণ ও জামিন বাতিলের দাবি জানান।
এ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রবেশ করে কিছু আইনজীবী হট্টগোল করেন এবং বিচার কার্যক্রমে বাধা দেন।
আদালতকক্ষে থাকা চেয়ার-টেবিল উল্টে দেয়া ও চিৎকার-চেঁচামেচির অভিযোগও ওঠে। ওই ঘটনায় নেতৃত্ব দেন সাদিকুর রহমান লিংকন। পরে বিষয়টি নজরে পড়ে আইন সংশ্লিস্ট দপ্তরের।
তবে বুধবার আদালতে আইনজীবীদের হট্টগোলের ঘটনায় বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রাহমান লিংকনসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় লিংকনকে প্রধান আসামি করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমানের জামিনের জন্য আইনজীবীরা আবেদন করলে মেট্রোপলিটন আদালতের বিচারক মিরাজুল ইসলাম রাসেল জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে প্রেরনের নির্দেশ দেন।
এদিকে, আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে গ্রেপ্তারের পর পরই আদালত প্রাঙ্গনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেন। তারা জানিয়েছেন- আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে মুক্তি না দিলে বরিশালের সকল আদালত কার্যক্রম বর্জন করবেন বলে তারা ঘোষনা দেন।
পরে পুলিশ গ্রেফতার আসামি সাদিকুর রহমান লিংকনকে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়ন করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে আদালতপাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার রাখা হয়েছে।
ইখা