কক্সবাজারের চকরিয়ায় উর্বর কৃষিজমিতে তামাক কোম্পানির স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। জমি ভরাট করে গুদাম তৈরির প্রস্তুতির খবর ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বিলের আবাদি জমি ও পুকুর ভরাট হলে কমে যাবে চাষের জমি, হুমকিতে পড়বে জীবিকা ও স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা।
উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের শাহওমর মাজারের পূর্ব পাশে বিস্তৃত একটি বিল। বর্ষায় সেখানে পানির ঝিলিক, শীতে সবুজ ধানের চাদরে ঢাকা পড়ে পুরো এলাকা। বছরের পর বছর এই বিলের জমিতে আমন ও বোরো ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন স্থানীয় শতাধিক কৃষক।
কিন্তু এখন সেই বিলে ট্রাকের পর ট্রাক বালু ও মাটি ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি কিনে সেখানে তামাকের গুদাম নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে আকিজ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় জমির মালিকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জমি কিনে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু আবাদি জমিই নয়, পাশের কয়েকটি পুকুরও ভরাট করা হচ্ছে। এতে বিলের আয়তন কমে যাচ্ছে এবং চাষের জমিও সংকুচিত হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শাহওমর মাজারের পূর্ব পাশে কয়েকটি স্থানে নতুন করে মাটি ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক সপ্তাহ ধরে বাইরে থেকে ট্রাকে করে মাটি আনা হচ্ছে। জমির পাশের দুটি পুকুরেও মাটি ফেলে ভরাটের কাজ চলছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, আগে যেখানে মৌসুমভেদে ধান, শাকসবজি ও মাছ পাওয়া যেত, এখন সেখানে স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। তাদের আশঙ্কা, একবার যদি এই বিলে স্থাপনা গড়ে ওঠে, তাহলে আশপাশের কৃষিজমিও একই পরিণতির দিকে যাবে।
ওই এলাকার বাসিন্দা এবং চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, “এই বিলের জমি ধান চাষের জন্য অত্যন্ত উর্বর। এলাকার শত শত কৃষক বর্গা নিয়ে এখানে চাষ করেন। বছরের খাদ্যচাহিদার বড় অংশ আসে এই জমি থেকে।”
তিনি বলেন, “এ বছর থেকে বিলের বড় অংশ ভরাটের কবলে পড়েছে। কৃষকদের জীবিকা রক্ষায় পরিবেশবিধ্বংসী এ প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।”
স্থানীয় কৃষক নাজির উদ্দিন, জহির ও কাইছারসহ কয়েকজন বলেন, “ধানের জমি কমলে আমরা যাব কোথায়? বাজারের চাল কিনে খাওয়ার সামর্থ্য সবার নেই।”
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, “শাহওমর মাজারসংলগ্ন বিলের কিছু জমি একটি টোব্যাকো কোম্পানি কিনেছে। শুনেছি, তারা সেখানে গুদাম নির্মাণের জন্য জমি ভরাট করছে।”
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, “অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি দখল ও শ্রেণি পরিবর্তনের ফলে আবাদি জমির পরিমাণ প্রতি বছর কমছে। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
জমি ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগে বক্তব্য জানতে ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে উপজেলা সদরে তাদের ডিপো অফিসে যোগাযোগ করা হলেও দায়িত্বশীল কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, “পরিবেশ আইনে পুকুর ভরাট ও কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন নিষিদ্ধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জানা গেছে, কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিজমি ও জলাভূমি রক্ষার প্রশ্ন নতুন নয়। নগরায়ন ও বাণিজ্যিক স্থাপনার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিল ও পুকুর ভরাটের প্রবণতাও বাড়ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, আজ যদি এই বিলের জমি হারিয়ে যায়, কাল হয়তো আশপাশের আবাদি জমিও একই পরিণতির মুখে পড়বে। তখন শুধু জমিই নয়, হারাবে একটি এলাকার কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রা।
ইখা