যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন আর্থিক বাধ্যবাধকতা যুক্ত হলো। মার্কিন সরকারের হালনাগাদ ‘ভিসা বন্ড’ তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় এখন থেকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মার্কিন ভিসা পেতে বাংলাদেশি নাগরিকদের সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হতে পারে। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে এই নিয়ম কার্যকর হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ৬ জানুয়ারি ভিসা বন্ডের আওতাভুক্ত দেশগুলোর তালিকা হালনাগাদ করে। এতে নতুন করে বাংলাদেশের নাম যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে এ তালিকায় বাংলাদেশসহ মোট ৩৮টি দেশ রয়েছে। তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের অস্থায়ী নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, বিশেষ করে বি১/বি২ (ব্যবসা ও পর্যটন) ভিসার ক্ষেত্রে এই বন্ড আরোপ করা হতে পারে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো আবেদনকারী ভিসার সব শর্ত পূরণ করলেও কনস্যুলার অফিসার চাইলে তার ওপর ভিসা বন্ডের শর্ত আরোপ করতে পারবেন। জামানতের পরিমাণ তিন ধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে—৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার মার্কিন ডলার। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত প্রোফাইল, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং সাক্ষাৎকারের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এই অঙ্ক নির্ধারণ করবেন।
এই জামানতের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘Pay.gov’-এর মাধ্যমে জমা দিতে হবে। তবে কনস্যুলার অফিসার লিখিত নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ জমা না দেওয়ার জন্য আবেদনকারীদের সতর্ক করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ভিসা বন্ড একটি পাইলট কর্মসূচির অংশ, যার মূল লক্ষ্য ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বা ‘ওভারস্টে’ কমানো। যেসব দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরে না আসার হার তুলনামূলক বেশি, মূলত সেসব দেশকেই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই কর্মসূচি প্রথম চালু হয় গত আগস্টে, তখন সীমিত কয়েকটি দেশ এতে যুক্ত ছিল।
ভিসা বন্ড স্থায়ীভাবে কেটে নেওয়া হবে না। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে এই অর্থ ফেরতযোগ্য। পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি কোনো ভ্রমণকারী অনুমোদিত সময়ের মধ্যে বা তার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন, ভিসা পেয়েও যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ না করেন, অথবা মার্কিন বিমানবন্দরে প্রবেশে বাধা পান—সে ক্ষেত্রে জমা দেওয়া জামানত ফেরত পাওয়া যাবে। তবে কেউ যদি নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভিসার স্ট্যাটাস পরিবর্তনের আবেদন করেন, যেমন রাজনৈতিক আশ্রয় বা এসাইলাম চাইলে, তাহলে সেই জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে।
এই বন্ডের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত যুক্ত হয়েছে। ভিসা বন্ড প্রদানকারী যাত্রীদের জন্য তিনটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো হলো—বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (BOS), নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (JFK) এবং ওয়াশিংটন ডুলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (IAD)। এসব নির্ধারিত পথ ছাড়া অন্য কোনো বিমানবন্দর ব্যবহার করলে বন্ডের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলে গণ্য হতে পারে, যা টাকা ফেরতের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ভুটান, কিউবা, জিবুতি, ফিজি, নাইজেরিয়া, নেপাল, উগান্ডাসহ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ। বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে এই নীতি ভিন্ন ভিন্ন তারিখ থেকে কার্যকর হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠবে। পর্যটন, ব্যবসা কিংবা স্বল্পমেয়াদি সফরের পরিকল্পনায় অতিরিক্ত আর্থিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।
ভিসা বন্ড মূলত একটি আর্থিক নিশ্চয়তা ব্যবস্থা, যা দিয়ে কোনো ভ্রমণকারী ভিসার শর্ত—বিশেষ করে থাকার সময়সীমা—মেনে চলবেন বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। যদিও বেশির ভাগ দেশই ভিসার সময় পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ চায়, তবে ফেরতযোগ্য জামানত নেওয়ার এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে খুব বেশি প্রচলিত নয়। অতীতে নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সীমিত পরিসরে এমন উদ্যোগ নিলেও পরে তা বাতিল করা হয়েছিল।
এইচএ