চারদিকে কনকনে শীত। সূর্যের দেখা নেই। শীত উপেক্ষা করে একদল যুবক ছুটে চলেছেন খেজুরের রসের সন্ধানে। শীত এলেই গাছ থেকে রস সংগ্রহের আয়োজন চোখে পড়ে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, কটিয়াদীসহ বিভিন্ন স্থানে।
এ ছাড়া পাশ্ববর্তী গফরগাঁও উপজেলার পাগলাসহ একাধিক এলাকাতেও খেজুরের রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এখানকার খেজুরের রসের খবর ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জেলাজুড়ে। ফলে প্রতিদিন ভোর থেকে গাছে ঝুলে থাকা রসের কলসগুলো নামিয়ে আনেন গাছিরা।
এ সময় নিচে অপেক্ষা করেন টাটকা রসের স্বাদ নিতে আসা নানা বয়সী মানুষ। খেজুরের রস শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভিড় লেগেই থাকে। তবে চাহিদা সামাল দিতে দিন-রাত সমানতালে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরাও। রসের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দামও।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৌষের শীতে চারদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ২০–৩০ বছর বয়সী শতাধিক যুবক মোটরসাইকেল, সিএনজি ও অটোরিকশাযোগে খেজুরের রস খাওয়ার জন্য ভিড় জমিয়েছেন। কয়েক দিন ধরেই ময়মনসিংহ, নান্দাইল, গাজীপুর, কাপাসিয়া, ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন রসপ্রেমীরা। কেউ প্রথমবার, কেউ আবার আগেও কয়েকবার এসেছেন। কেউ বোতলে করে রস নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে, আবার কেউ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আনন্দের সঙ্গে রস পান করছেন। প্রতি গ্লাস রস বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, আর এক কেজি রসের দাম ২০০ টাকা। এবার খেজুরের রসের দাম দ্বিগুণ, কোথাও কোথাও তিন গুণ হওয়ায় দাম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রসপিপাসুরা।
গাছিরা জানান, প্রতিবছর এই মৌসুমে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে খেজুরের রস খেতে আসেন। কারণ এটি জেলার এমন একটি স্থান, যেখানে গুণে, মানে ও স্বাদে অতুলনীয় রস পাওয়া যায়। এই রস মূলত ভোরেই ভালো লাগে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের স্বাদ কমে যায়। খেজুরগাছের ডালপালা পরিষ্কার করে ডগার দিকের কাণ্ড চেঁছে তাতে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি চোঙ বসানো হয়। চোঙের শেষ প্রান্তে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় একটি মাটির হাঁড়ি বা কলসি। সেখানেই ফোঁটা ফোঁটা রস জমা হয়। এভাবে তারা দৈনিক গড়ে ২০–২৫ লিটার রস সংগ্রহ করেন। আগে এক লিটার রস ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ১৮০–২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবুও দিন দিন চাহিদা বাড়ছে।
রসের স্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রসপ্রেমীরা জানান, কুয়াশা ভেদ করে তারা টাটকা রসের স্বাদ নিতে ছুটে এসেছেন। দল বেঁধে টাটকা রস পান করাটা যেন এক ধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে। তবে চাহিদা বেশি থাকায় অনেক সময় ভোরের আলো ফোটার আগেই রস শেষ হয়ে যায়। একজন রসপ্রেমী বলেন, “গত বছর প্রতি কেজি খেজুরের রস ১৩০ টাকায় কিনেছি, কিন্তু এবার কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকায়।”
জেলা শহরের আখড়া বাজার এলাকা থেকে আসা আরমান হোসেন বলেন, শীতকালে বাঙালির প্রধান আকর্ষণ খেজুরের রস। প্রতিবছর এই মৌসুমে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এখানে আসে। গাছ থেকে হাঁড়ি নামাতে দেরি হলেও হাঁড়ি শেষ হতে দেরি হয় না।
গাজীপুর থেকে আসা মোহাম্মদ সাহা আলম বলেন, “এখানকার খেজুর রসের কথা অনেক শুনেছি। আজ প্রথমবার গাছ থেকে নামানো টাটকা রস পান করলাম। খুব ঠান্ডা থাকলেও রস আর ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ দারুণ লেগেছে। এটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।”
গাছি হেলাল উদ্দিন জানান, এক গ্লাস রস ৫০ টাকা ও এক লিটার রস ২০০ টাকা দরে বিক্রি করে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হয়। তবে আগের মতো গাছ নেই। চোরের ভয়ে রাতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে রস পাহারা দিতে হয়। রস কিনতে হলে সাত দিন আগে সিরিয়াল দিতে হয়।
রস বিক্রেতা আলাল মিয়া বলেন, খুব বেশি লাভ না হলেও এটি একটি সৌখিনতা। ভোরে এলাকাটি যেন হাটবাজারে পরিণত হয়। নিপা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, রস সংগ্রহের হাঁড়ি নেট দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে বাদুড় বা পাখি সংস্পর্শে না আসে।
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার, পরিপাকতন্ত্র ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মুহাম্মদ আবিদুর রহমান ভূঞা বলেন, খেজুরের রস পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এতে আয়রন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাসসহ নানা খনিজ উপাদান রয়েছে, যা প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংকের মতো কাজ করে। তবে কাঁচা রস পান করার ক্ষেত্রে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকতে হবে।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. অভিজিত শর্মা বলেন, কাঁচা খেজুরের রস বা বাদুড়ের সংস্পর্শে আসা খাদ্য থেকে নিপা ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই শীত মৌসুমে কাঁচা রস না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, পাকুন্দিয়াসহ কয়েকটি উপজেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে গাছিদের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রণোদনার মাধ্যমে খেজুরগাছ রোপণ বাড়ানো হচ্ছে।
পাকুন্দিয়া উপজেলার নারান্দি ও হোসেন্দি ইউনিয়নে ছোট-বড় ৮৫টি গাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৩০ কেজি খেজুরের রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতি লিটার রস বিক্রি হচ্ছে ১৮০–২০০ টাকায়। শীতের এই মৌসুমে খেজুরের রস শুধু বেচাকেনার বিষয় নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার এক জীবন্ত চিত্র হয়ে উঠেছে।
এনআই