দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া–লোহাগাড়া অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্য, বনফুল গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় অর্থায়নের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আব্দুল মোতালেব এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের অর্থ জমা রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরণ এবং পাচারের সম্ভাব্য পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে সরকারি দপ্তর, প্রকল্প ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বিভিন্ন সুবিধা আদায় করেন আব্দুল মোতালেব। ওই সুযোগ ব্যবহার করে বনফুল গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক চ্যানেলের মাধ্যমে আয় করা অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ভুয়া আমদানি–রপ্তানি দেখানো, ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং এবং হুন্ডি ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাচারের আলামত পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে দীর্ঘদিন এসব কর্মকাণ্ড কার্যত প্রশ্নের বাইরে ছিল। তবে সরকারের পরিবর্তনের পর পুরোনো আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে গিয়ে বিষয়গুলো সামনে আসছে।
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত অভিযোগ হলো, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে অর্থ জোগানদাতাদের একজন ছিলেন আব্দুল মোতালেব। আন্দোলন দমন, দলীয় কর্মসূচি পরিচালনা এবং মাঠপর্যায়ের সহিংসতায় অর্থ সরবরাহের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।
লোহাগাড়া থানায় দায়ের করা একটি মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত ২০ জুলাই লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদের সামনে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন সংসদ সদস্য আব্দুল মোতালেবের নির্দেশে আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও পেট্রোলবোমা নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে বাদীসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হন এবং মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
মামলার বাদী মো. ফারুকুল ইসলাম (৩৬) আধুনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা। মামলায় আব্দুল মোতালেবসহ ২৪৭ জনকে এজাহারনামীয় এবং অজ্ঞাত আরও ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব মামলা ও তদন্তের পর থেকে আব্দুল মোতালেব প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যাচ্ছেন না। তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন—এমন আলোচনা এলাকাজুড়ে রয়েছে।
উল্লেখ্য, সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বনফুল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আব্দুল মোতালেব একাধিকবার রাজনৈতিক সভা–সমাবেশে নিজ এলাকা ‘জামায়াত–শিবিরমুক্ত’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক অভিযোগ, মামলা ও তদন্তের পর তাঁর সেই সক্রিয় রাজনৈতিক উপস্থিতি আর দেখা যাচ্ছে না।
অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বনফুল গ্রুপের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অর্থপাচার, রাজনৈতিক সহিংসতায় অর্থায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আব্দুল মোতালেবকে ঘিরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের মতে, এই তদন্ত শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং রাজনীতি, ব্যবসা ও অর্থনীতির দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছ যোগসাজশের একটি বড় উদাহরণ হিসেবেও বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
ইখা