ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর আংশিক) আসনে ভোটের রাজনীতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা আমির এস. ইউ. এম. রুহুল আমিন ভূঁইয়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই প্রার্থীর সক্রিয় প্রচারণায় বদলাতে শুরু করেছে আসনের ভোটের সমীকরণ।
রায়পুর উপজেলা ও সদর অংশের ইউনিয়নগুলোতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হচ্ছে পথসভা, গণসংযোগ, কর্মীসভা ও মতবিনিময় সভা। ব্যানার, পোস্টার ও স্লোগানে সরগরম হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাজার এলাকা। স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এখন দুই ‘ভূঁইয়া’।
রায়পুর পৌরসভার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুস সালাম বলেন, “আগে মানুষ দল দেখে ভোট দিত। এবার অনেকেই প্রার্থী দেখে সিদ্ধান্ত নেবে। যিনি এলাকায় থাকেন, মানুষের সুখ–দুঃখে পাশে থাকেন, তাকেই মানুষ চাইছে।”
চরবংশী ইউনিয়নের গৃহবধূ নাজমা বেগম বলেন, “আমরা শান্তি আর নিরাপত্তা চাই। যে প্রার্থী নারীদের কথা ভাববেন, তাকেই ভোট দেব।”
একই এলাকার যুবক রাসেল হোসেন বলেন, “এবার ভোটের হিসাব সহজ না। আগের মতো একদল একচেটিয়া থাকবে না। সবাই ভেবেচিন্তে ভোট দেবে।”
ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা—এই তিনটি বিষয়ই এবারের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
বিএনপি প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়া নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক বৈঠকের মাধ্যমে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর প্রচারণায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, “লক্ষ্মীপুর-২ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ঐতিহ্যের আসন। জনগণ পরিবর্তন চায়। আমরা সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে প্রস্তুত।”
উপজেলা বিএনপির সভাপতি জেড এম নাজমুল ইসলাম মিঠু বলেন, “এই আসনে বিএনপির ভোটব্যাংক এখনো শক্ত। দল ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিজয় আমাদেরই হবে।”
তবে স্থানীয়ভাবে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কিছু এলাকায় সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস. ইউ. এম. রুহুল আমিন ভূঁইয়াও সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি নিজে নিয়মিত গণসংযোগ ও কেন্দ্রভিত্তিক সভায় অংশ নিচ্ছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা প্রচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখছেন।
রুহুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, “আমরা ক্ষমতার রাজনীতি নয়, ন্যায়ের রাজনীতি করতে চাই। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।”
রায়পুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আউয়াল রাছেল জানান, “ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত প্রার্থী পরিচিতি ও দাওয়াতি সভা হচ্ছে। তৃণমূলে আমরা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।”
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, নারী ভোটার ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন আগের তুলনায় বাড়ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, “লক্ষ্মীপুর-২ আসনে এবার একক আধিপত্যের রাজনীতি নেই। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ভোট ভাগাভাগি হবে। ফলে ফলাফল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিত থাকতে পারে।”
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামাল উদ্দিন বলেন, “ভোটাররা এবার অনেক বেশি সচেতন। ব্যক্তি ইমেজ, সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠে উপস্থিতিই জয়–পরাজয়ের ফয়সালা করবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনের ফলাফল শুধু স্থানীয় রাজনীতিতে নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসন এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে। বিএনপি ও জামায়াতের এই দ্বিমুখী লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত। একটি বিষয় নিশ্চিত—এ আসনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
ইখা