এইমাত্র
  • বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক এজেন্ডায় জড়িত ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার
  • আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের ধানের শীষে ভোট করতে বাধা নেই
  • ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান ইইউর ৪০৪ সাবেক কর্মকর্তার
  • ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প
  • এবার এক পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল চীন
  • শবে বরাতে দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার
  • উত্তেজনার মধ্যেই তুরস্কে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
  • ভোরে ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ
  • আজ পবিত্র শবে বরাত
  • পরিবারতন্ত্র ভাঙতে হলে শাপলাকলিকে ভোট দিতে হবে: আসিফ মাহমুদ
  • আজ মঙ্গলবার, ২০ মাঘ, ১৪৩২ | ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
    দেশজুড়ে

    হাওরের বুকে কোটি টাকার রাজস্ব: আঠারবাড়িয়া গুপি রায়ের গরুর হাট

    সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪১ এএম
    সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪১ এএম

    হাওরের বুকে কোটি টাকার রাজস্ব: আঠারবাড়িয়া গুপি রায়ের গরুর হাট

    সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪১ এএম

    সপ্তাহের প্রতি বুধবার এলেই নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের আঠারবাড়িয়া গুপি রায়ের বাজার যেন নতুন রূপ নেয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই হাট এলাকায় ভিড় জমতে শুরু করে। ট্রাক, পিকআপ আর পায়ে হাঁটা খামারিদের গরুতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। গরুর ডাক, দরদামের কোলাহল আর মানুষের ব্যস্ত পদচারণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-এটি কেবল একটি হাট নয়, এটি নিকলীর গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র।

    ২০০৯ সালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে গরুর হাট হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই বাজারটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ আঞ্চলিক পশুর হাটে। ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বাজারটি ৭৩৭ দাগে মোট ৩৬ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। হাটের পরিধি বাড়ায় আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়ভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে চলমান।

    স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বুধবার বসা এই হাটে গড়ে ৫ হাজারেরও বেশি গরু ওঠে। শুধু স্থানীয় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খামারি ও বিক্রেতারা এখানে গরু নিয়ে আসেন। একইভাবে পাইকারদেরও ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, হালুয়াঘাট, ত্রিশাল, শেরপুর, নালিতাবাড়ীসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকাররা এই হাটে গরু কিনতে আসেন। হাটে প্রতিটি গরু থেকে ইজারা বাবদ ক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকেও ৩০০ টাকা নেওয়া হয়। এর ফলে প্রতি হাটে শুধু গরু থেকেই ইজারা বাবদ আয় হয় প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা। পাশাপাশি ছাগল বেচাকেনা থেকেও আসে অতিরিক্ত ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা।

    এই গরুর হাটের সবচেয়ে বড় পরিচয়-সরকারি রাজস্ব আয়ে এর উল্লেখযোগ্য অবদান। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে ইজারা মূল্য ছিল প্রায় ৩০ লাখ টাকা, সেখানে চলতি মৌসুমে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইজারা সম্পন্ন হওয়ায় সরকারের কোষাগারে জমা পড়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা। স্থানীয় প্রশাসন ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সংখ্যাগত সাফল্য নয়; বরং গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনার একটি বড় উদাহরণ।

    এই হাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল কর্মসংস্থান। প্রতি হাটবারে শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন-গরু নামানো, তোলা, দেখাশোনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায়। শ্রমিকদের প্রত্যেককে কাজের ধরন অনুযায়ী ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়।

    হাটে কাজ করা শ্রমিক সাহাব উদ্দিন বলেন, এই হাটের ওপরই আমাদের পরিবারের অনেকটা নির্ভরতা। সপ্তাহে একদিন কাজ করেই সংসারের বড় খরচ উঠে আসে। দালালমুক্ত বাজার, হয়রানিহীন বেচাকেনা এই হাটের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো-দালালদের দৌরাত্ম্য নেই। ফলে বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই সরাসরি দরদাম করতে পারেন। এতে করে হয়রানি কম হয়, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হয় এবং বাজারে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।

    হাট বসার দিনে শুধু পশু বেচাকেনাই নয়, আশপাশের মুদি দোকান, হকার, চা-খাবারের দোকান ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদেরও ব্যস্ততা বাড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি হাটবারে এই হাটকে কেন্দ্র করে তাদের সম্মিলিত বিক্রি হয় কয়েক লাখ টাকা। ফলে হাটটি এলাকার সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

    জানা যায়, আঠারবাড়িয়া গুপি রায়ের গরুর হাট পরিচালিত হয় একটি ব্যতিক্রমী সামাজিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। ১৩টি সমাজ ব্যবস্থার অধীনে এই হাটটি ডেকে আনা হয় এবং একজন ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হাটের ডাক দেওয়া হয়। এই নামভিত্তিক ডাক দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক প্রথা, যা স্থানীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলার প্রতীক। এই সামাজিক ডাক থেকে প্রাপ্ত অর্থ একটি সামাজিক ফান্ডে জমা হয়, যা পরিচালনা করেন এলাকার সকল মসজিদ কমিটি। এই ফান্ড থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে সহযোগিতা করা হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

    হাটের ইজারাদার আলী জামশেদ বলেন, সরকারকে নির্ধারিত রাজস্ব দেওয়ার পাশাপাশি হাটের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে নিজ উদ্যোগে নিয়মিত ব্যয় করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এই হাট শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, এটি মানুষের আস্থার জায়গা। তাই নিয়ম মেনে সুন্দরভাবে পরিচালনাই আমাদের লক্ষ্য। এই হাটের মাধ্যমে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব পাচ্ছে, তেমনি হাজারো মানুষের জীবিকা নিশ্চিত হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি নিয়ম মেনে, স্বচ্ছভাবে এবং মানুষের ভোগান্তি ছাড়াই হাট পরিচালনা করতে।

    তিনি আরও জানান, আঠারবাড়িয়া গুপি রায়ের গরুর হাট ইতোমধ্যে একটি মডেল গ্রামীণ হাট হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। দালালমুক্ত বেচাকেনা, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক ফান্ড ব্যবস্থাপনা ও সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব-সব মিলিয়ে এই হাট দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।

    হাওরাঞ্চলের নিস্তরঙ্গ জীবনে প্রতি বুধবার আঠারবাড়িয়া গরুর হাট যেন জীবিকার এক উৎসব। এখানে শুধু গরু কেনাবেচা হয় না-এখানে বেচাকেনা হয় মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সম্ভাবনার গল্প।

    এসআর

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    সর্বশেষ প্রকাশিত

    Loading…