ঝিনাইদহে উদ্বেগজনক হারে বিবাহবিচ্ছেদ বেড়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় আদালত ও জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় বিবাহ হয় আট হাজার ২৬টি আর বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে তিন হাজার ৯৮৪টি। গড়ে প্রতিদিন বিবাহ হয় ২১টি আর বিচ্ছেদ ঘটে ১১টি।
স্থানীয় একাধিক সূত্র মতে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, পারিবারিক কলহ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, মাদকাসক্তিসহ নানা কারণে ভাঙছে সংসার।
জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে আট হাজার ২৬ জন নারী-পুরুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। একই বছর বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে তিন হাজার ৯৮৪টি। এর মধ্যে পুরুষ এক হাজার ৩৪৬ জন ও নারী দুই হাজার ২৩৪ জন বিবাহবিচ্ছেদ করেছেন।
সবচেয়ে বেশি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে সদর উপজেলায়। এই উপজেলায় এক হাজার ১৬২ জন নারী-পুরুষ বিবাহবিচ্ছেদ করেছেন। এ ছাড়া শৈলকুপায় ৭৯৪ জন, মহেশপুরে ৯৭৮ জন, কালীগঞ্জে ৪৭৭ জন, হরিণাকুণ্ডুতে ৩৬২ জন ও কোটচাঁদপুরে ২১১ জন নারী-পুরুষ বিবাহবিচ্ছেদ করেন। এর মধ্যে পুরুষরা তালাক দিয়েছেন এক হাজার ৩৪৬টি আর নারীরা দিয়েছেন দুই হাজার ২৩৪টি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরুষের চেয়ে নারীর তালাকের হার অনেক বেশি।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে জেলায় মোট তিন হাজার ১৭৭টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় আটটি। একই সময়ে বিবাহ নিবন্ধিত হয়েছে সাত হাজার ৩২৭টি। প্রতিদিন গড়ে ২০টি।
তালাকের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্ত্রী কর্তৃক তালাকের সংখ্যা এক হাজার ১৬৬টি, স্বামীর পক্ষ থেকে ২৫৯টি এবং উভয়ের সম্মতিতে এক হাজার ৭৫২টি।
সরাসরি স্বামী বা স্ত্রীর উদ্যোগে হওয়া তালাকের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় সাড়ে চার গুণ বেশি, যা পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তিত বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর আগের বছরও একই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৬টি বিবাহের বিপরীতে তালাক হয় তিন হাজার ৯৮৪টি। ২৪টি করে বিয়ে, বিচ্ছেদ ১০টি। ওই বছর স্ত্রী কর্তৃক তালাকের আবেদন ছিল এক হাজার ৭৪৬টি এবং পুরুষের পক্ষ থেকে ৩৮৪টি। ২০১৯ থেকে ২০২৪ এই ছয় বছরে জেলায় প্রায় ১৮ হাজার তালাকের ঘটনা ঘটেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
তালাক নোটিশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিবাহবিচ্ছেদে ঘুরেফিরে একই কারণ দেখিয়েছেন আবেদনকারীরা। আবেদনগুলোতে তালাকের কারণ হিসেবে বেশির ভাগই ছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া। স্ত্রীর করা আবেদনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভরণ-পোষণ না দেওয়া, স্বামীর প্রতি সন্দেহের মনোভাব, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধকরণ, কাবিন না হওয়া, মাদকাসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, স্ত্রীর ওপর নির্যাতন, যৌতুক, মানসিক পীড়ন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, আর্থিক সমস্যা ও ব্যক্তিত্বের সংঘাত।
অন্যদিকে স্বামীরাও তাঁদের নোটিশে উল্লেখ করেছেন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, বেপরোয়া জীবনযাপন, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়া, অবাধ্য হওয়া, টিকটকসহ সামাজিক মাধ্যমে অবাধ বিচরণ করা, ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী না চলা ইত্যাদি।
ঝিনাইদহ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি খলিলুর রহমান বলেন, ‘আগে মাসে ৮ থেকে ১০টি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটত। তবে এখন অনেক সময় দিনে ১০ থেকে ১২টি তালাক নিবন্ধন করতে হয়। বেশির ভাগ দম্পতি ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই বিচ্ছেদের পথে যাচ্ছেন।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জাকারিয়া মিলন বলেন, ‘এখনকার তরুণ দম্পতিদের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা কম। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সমস্যা সমাধানের চর্চা কমে গেছে। ফলে অনেক সময় ছোটখাটো বিরোধ থেকেও বিবাহবিচ্ছেদ ঘটছে।
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মানবাধিকারকর্মী আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘বিবাহবিচ্ছেদের উচ্চহার শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত। এ ঘটনা কমাতে পারিবারিক শিক্ষা, পারস্পরিক সম্মানবোধ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সহায়তাকে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সেলিং সেবা চালু ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
সদর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আব্দুল হাই বলেন, ‘বিবাহবিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুসন্তান। অনেক সময় তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, মানসিক আঘাত তৈরি হয়। তাই বিবাহের আগে নারী-পুরুষ উভয়ের চিকিৎসকের পরামর্শ ও কাউন্সেলিং প্রয়োজন।
জেলা মহিলা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মুন্সী ফিরোজা বলেন, ‘অনেকগুলো কারণে বর্তমানে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অল্প বয়সে বিবাহ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার। আবার বহুবিবাহের কারণেও এমন ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
তিনি বলেন, ‘বিবাহবিচ্ছেদ রোধে আমাদের মাঠকর্মীরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়াও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। আশা করছি শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান ঘটবে।’
এসআর