ভোলায় হঠাৎ করে বেড়েছে ঠান্ডাজনিত রোগ নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার প্রকোপ। এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন শিশুরা। সম্প্রতি নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াতে ২ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত রোগে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভীড় করছেন রোগী ও তার স্বজনরা। এতে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের নার্স ও স্টাফরা। এ ছাড়াও দেখা দিয়েছে বেড সংকট। এক বেডে ২ থেকে ৩ জন শিশু রোগী ভর্তি রেখে দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন রোগীর স্বজনরা।
ভোলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, গেল ২৪ ঘন্টার ভোলা সদর হাসপাতালে নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯ জন, ডায়রিয়ায় ২২ জন রোগী। এ ছাড়াও ২৪ ঘন্টার জেলায় নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৬ জন এবং ডায়রিয়ায় ৬৩ জন। গেল ৭ দিনে নিউমোনিয়া নিয়ে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৮ জন এবং ১৫ দিনে ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন ২১১ জন। জেলায় ৭ দিনে নিউমোনিয়া রোগী ভর্তির সংখ্যা ২১৪ জন, ডায়রিয়ায় ৪৯৫ জন। এরমধ্যে, গেল ৭ দিনে নিউমোনিয়া ১ শিশু ও গেল ১৫ দিনে ডায়রিয়ায় ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ভোলা সদর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে ঢোকার প্রবেশ পথের মেঝেতেই বেড বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে শিশু রোগীর চিকিৎসা। এ ছাড়া ওয়ার্ডের প্রতিটি বেডে রয়েছে একের অধিক শিশু রোগী। একই বেডে একাধিক শিশু রেখে চিকিৎসা দেওয়ায় স্বজনরা পরেছেন বিপাকে। অনেক স্বজন বসার স্থান না পায়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এতে তাদের মধ্য তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে।
অপরদিকে, চিকিৎসা সেবা, ঔষধ ও সরঞ্জামাদী নিয়ে রোগীর স্বজনদের রয়েছে নানা অভিযোগ। বেশির ভাগ ঔষুধ, ক্যানুলা, সিরিঞ্জ ও নেবুলাইজার মাস্ক টাকা দিয়ে কিনে আনতে হচ্ছে বাহিরে থেকে। সরকারি হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা সেবা না পেয়ে হাতাশা প্রকাশ করছেন তারা।
ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশু রোগীর মা নাজমা বেগম জানান, ছেলের জ্বর, সর্দি ও কাশি নিয়ে গেল দুই দিন আগে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনি। কিন্তু একই বেডে রয়েছে আরও একটি শিশু। এতে চিকিৎসা সেবা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। হাসপাতালের পরিবেশ আর চিকিৎসা সেবা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে তার। বেশিরভাগ ঔষধ, সিরিঞ্জ, ক্যানুলা কিনে আনতে হচ্ছে বাহিরে থেকে।
শিবপুর ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন রুমা বেগম জানান, তার একমাত্র মেয়ের ঠান্ডাজনিত রোগে গেল ৫ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসায় শিশুর কিছুটা উন্নত হলেও ছাড়পোকার জ্বালায় অতিষ্ঠ তিনি। বেডের নিচে থাকা ছাড়পোকার ঢুকে পড়েন খাবারে ও কাপড়ে। এছাড়াও বাচ্চার কানে ছাড়পোকা ঢুকে যাওয়ার ভয়ে ঘুমাতে পারেন না শিশু।
দৌলতখান থেকে আসা মেহেদী হাসান জানান, তার ছেলের শ্বাসকষ্ট হওয়ায় মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আজ সকালে তাদের বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) রেফার্ড করেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সামান্য রোগেও ভোলায় চিকিৎসা পাওয়া যায় না। কিছু হলেই বরিশাল পাঠিয়ে দেয়। নদী পথে বাচ্চাদের নিয়ে বরিশাল যাওয়া যেন আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই।
আমেনা বেগম জানান, ছেলের ডায়রিয়া জনিত কারণে দুই দিন ধরে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনি। শীতের মধ্যে সন্তানকে হাসপাতালের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন। এতে শিশুর ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা করছেন। বেড না পেয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে শিশুদের জন্য অতিরিক্ত বেড বৃদ্ধির দাবি জানান তিনি।
ভোলা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান জানান, ‘গেল ২৪ ঘন্টায় ভোলা সদর হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৯ জন, ডায়রিয়ায় ২২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যাই বেশি।শীত আসলে শিশুদের ঠান্ডাজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়। এ সময় অভিভাবকদের সচেতন হওয়া খুব জরুরি। শিশুদের যেনো ঠান্ডা না লাগে সে বিষয়ে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশু রোগীরদের জন্য আলাদাভাবে বেড সংকুলান না থাকায় এবং রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় একই বেডে একের অধিক শিশু ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
ভোলার সিভিল সার্জন ডাক্তার মো.মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘শীতের শুরুতে ভোলার সাত উপজেলায় নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। শীতকালীন রোগ প্রতিরোধে শিশুদের অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিশুদের প্রতি যত্নশীল হলে ঠান্ডাজনিত রোগ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ছাড়াও শীতের সময়ে 'রোটা' ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। এ সময় খাবার খাওয়ার বিষয়ে সকলের সচেতন হতে হবে।’
এ ছাড়াও হাসপাতালের ঔষধ, সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও ন্যাবুলাইজার মাক্সের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের এগুলোর সরবাহ রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু সরঞ্জামাদী তাংক্ষনিক না পাওয়া গেলে স্বজনদের বাহিরে থেকে কিনে আনার জন্য বলা হয়।’ তবে হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা হবে বলেও জানান তিনি।
ইখা