চূড়ামনি ও লটমনি। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার সীমান্ত এলাকার ওই দুই মৌজা বছর দশেক আগেও পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলে একাকার ছিল। সেই পাহাড়, টিলা ও বনের মধ্যেই এখন কয়েকটি ইটভাটা। পাহাড় ও টিলার মাটি ব্যবহার করেই তৈরি করা হচ্ছে ইট। এতে সেখানকার সেই পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলের অস্তিত্ব তেমন চোখে পড়ে না। এরই মধ্যে আস্ত কয়েকটি পাহাড় ইটভাটার পেটে চলে গেছে।
সাতকানিয়ার পশ্চিমাংশের চূড়ামনি ও বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব সীমানার লটমনি এলাকায় পাহাড়, টিলা ও বনের পাশেই গড়ে উঠেছে এই কয়েকটি ইটভাটা। স্থানীয় মানুষজনের ভাষ্য, এই ভাটাগুলোর মালিকেরা প্রতিবছর ইট তৈরির মৌসুমে পাশের পাহাড় ও টিলা থেকে মাটি কেটে নিয়ে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। কয়েকটিতে দেদার পোড়ানো হচ্ছে বনের কাঠও। এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে পাহাড় ও টিলার অস্তিত্ব মুছে যাবে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুসারে পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তা ছাড়া, কোনো পাহাড় বা টিলার উপরিভাগে, ঢালে বা তৎসংলগ্ন সমতলে এবং পাদদেশ হতে আধা কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। কোনো ইটভাটায় কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরির বিধানও নাই।
সরেজমিনে দেখা যায়, লটমনি ও চূড়ামনির প্রায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে পাহাড় ও টিলা ঘেঁষে রয়েছে এইচএবি ব্রিকস, কেবিথ্রি ব্রিকস, বিসমিল্লাহ ব্রিকস, এবিসি ব্রিকস, কেএমবি ব্রিকস, মেসার্স মা ব্রিকস ও মেসার্স খাজা ব্রিকস। ইটভাটাগুলোর পাশের পাহাড় ও টিলার গায়ে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কেটে নেওয়ার দগদগে চিহ্ন। কথা বলে জানা গেল, এসব ভাটায় পাশের পাহাড় ও টিলার মাটি দিয়েই শ্রমিকেরা ইট তৈরি করছেন। কিছু ক্ষেত্রে পাহাড় কাটার সুবিধার্থে গাছপালা উজাড় করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি স্থানে পাহাড় কাটা হচ্ছে একেবারেই চূড়া থেকে। এরপর মাটিগুলো ডাম্পার ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক দিয়ে ট্রাক চলাচলের ফলে ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থানীয়দের চলাচলে চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুজন ইটভাটার শ্রমিক বলেন, পাশাপাশি ভাটাগুলোর কোনোটিতে ইটের কাঁচামাল হিসেবে বাইরের কোনো মাটি আনতে হয় না। পাশের পাহাড় ও টিলার মাটি কেটেই ইট তৈরি করা হয়।
এওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, পাহাড় খেকোরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে পাহাড় কেটে ইটভাটায় মাটি পাচার করছে। প্রশাসন মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করে দায় সারেন। শুধু জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকলে পাহাড় কাটা থামানো সম্ভব নয়। জরিমানার পাশাপাশি পাহাড় কাটার কাজে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে পরিবেশ আইনে মামলা করা প্রয়োজন। এরপরই পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ হবে।
একই ইউনিয়নের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আব্দুস শুক্কুর বলেন, যখন থেকে এখানে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে, তখন থেকেই ব্যাপক হারে পাহাড় কাটা শুরু হয়েছে। পাহাড়ের মাটি ইটভাটায় ব্যবহারের সুবিধার্থে কিছু অসাধু ব্যক্তি পাহাড় ঘেঁষে ইটভাটাগুলো গড়ে তুলেছে। ফলে পার্শ্ববর্তী বেশিরভাগ পাহাড় ধ্বংস হয়েছে। এক সময় এখানে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী দেখা যেত, কিন্তু বর্তমানে তা নেই। প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এখানে আর কোনো পাহাড় খুঁজে পাওয়া যাবে না।
গণমাধ্যমকর্মী মঞ্জুর আলম বলেন, সরকারের আইন অনুসারে পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলের পাদদেশে ইটভাটা স্থাপনে সম্পূর্ণ বিধিনিষেধ থাকলেও এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে এখানকার ভাটামালিকেরা তাঁদের অবৈধ কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনের লোকজন অদৃশ্য কারণে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, সম্প্রতি পাহাড় কাটার দায়ে ছনখোলা গ্রামের ৬টি ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করেছি। এর মধ্যে ৫টি ইটভাটাকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা ও একটি ইটভাটাকে এক লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি সিলগালা করা হয়েছে। পাহাড় ও টিলার মাটি কাটার বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এফএস