আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপি মনোনীত দুই প্রার্থী গিয়াস কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকারের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বিপুল সম্পদের পাশাপাশি অস্বাভাবিক অঙ্কের ঋণের চিত্র। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা এই হলফনামাগুলো শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, ব্যাংকঋণ সংস্কৃতি ও ব্যবসা–রাজনীতির জটিল সম্পর্কের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, দুই প্রার্থীই কাগজে-কলমে কোটিপতি। তবে তাদের ঘোষিত সম্পদের তুলনায় ঋণের পরিমাণ এতটাই বড় যে তা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গিয়াস কাদের চৌধুরীর ক্ষেত্রে সম্পদের তুলনায় ঋণের অঙ্ক কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় বিষয়টি নজর কেড়েছে সচেতন ভোটার ও বিশ্লেষকদের।
হলফনামায় দেখা যায়, গিয়াস কাদের চৌধুরীর মোট ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ২৫ কোটি ৭৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯৭ টাকা। অথচ এর বিপরীতে তার নামে ঘোষিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা তার ঘোষিত সম্পদের বহু গুণ বেশি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তার সম্পৃক্ততার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি একাধিক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই বিপুল অঙ্কের ঋণ রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তার আর্থিক বিবরণে দেখা যায়, অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ অর্থ হিসেবে তার হাতে রয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৩২ হাজার ১৫৪ টাকা। শেয়ার ও বন্ডে বিনিয়োগের ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ৯৬ লাখ ৯০ হাজার ২১৪ টাকা, যার বর্তমান বাজারমূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৪৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩২০ টাকা। এ ছাড়া তার মালিকানায় রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য, আসবাবপত্র ও একটি আগ্নেয়াস্ত্র, যার সম্মিলিত মূল্য কয়েক লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের হিসাবে কৃষিজমির মূল্য নামমাত্র দেখানো হলেও অকৃষি জমির ক্ষেত্রে তার ঘোষিত বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য। অকৃষি জমিতে তার বিনিয়োগের ক্রয়মূল্য ১ কোটি ১২ লাখ ৫০৯ টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬ টাকা। আয় সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তিনি বছরে ৩১ লাখ টাকা আয় করেন এবং সর্বশেষ অর্থবছরে তিনি আয়কর পরিশোধ করেছেন ৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
তবে এই সম্পদের বিপরীতে তার ঋণের চিত্র আরও বিস্ময়কর। হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, অগ্রণী ব্যাংকে তার নামে ঋণ রয়েছে ২৯৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। একইভাবে ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ১৬৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকে ২০১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংকে ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে ৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। এসব ঋণের অধিকাংশই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হলেও, ঋণের অঙ্ক ও বিস্তৃতি জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে গোলাম আকবর খোন্দকারের হলফনামায়ও উঠে এসেছে বিপুল সম্পদ ও ঋণের চিত্র, যদিও তার ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। তার ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৬ কোটি ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ১৬০ টাকা। এই সম্পদের বিপরীতে তার ঋণের পরিমাণ ২৭ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ১৫১ টাকা বলে হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি লংকা বাংলা সিকিউরিটিজ এবং তার স্ত্রীর কাছেও তার দায় রয়েছে আরও ৮ লাখ ২৩ হাজার ৫৬০ টাকা।
গোলাম আকবর খোন্দকারের অস্থাবর সম্পদের বিবরণে দেখা যায়, তার কাছে নগদ রয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৩৩ হাজার ৫ টাকা। ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র ২ লাখ ১ হাজার ৯৯৬ টাকা। শেয়ার ও বন্ডে তার বিনিয়োগের ক্রয়মূল্য ২ কোটি ৪৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩৪ টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্য কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ ১ হাজার ৫৫৯ টাকা, যা পুঁজিবাজারের ওঠানামার প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া তার মালিকানায় রয়েছে ৩০ লাখ টাকার একটি গাড়ি, সোনা জাতীয় ধাতু, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলেকট্রনিক পণ্য এবং আসবাবপত্র। স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তার দখলে রয়েছে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের অকৃষি জমি, একটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট এবং একটি আবাসিক ফ্ল্যাট। আয় সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, শেয়ার ও বন্ড থেকে তিনি বছরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯৭ টাকা আয় করেন এবং পেশাগত আয়ের পরিমাণ ১০ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৭ টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরে তিনি আয়কর দিয়েছেন ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩৯ টাকা।
হলফনামায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ইউনিয়ন ব্যাংকের কাছে তার নামে ২৭ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ১৫১ টাকা ঋণ রয়েছে, যা তার মোট ঋণের বড় অংশ।
এফএস