পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে শরীয়তপুরের ডামুড্যার তিলই গ্রামে থেমে গেছে একটি পুরো সংসারের জীবনচাকা। ওষুধ ব্যবসায়ী ও বিকাশ এজেন্ট খোকন চন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে হত্যার পর স্ত্রী, তিন শিশু সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মা নিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা।
ছোট তিনটি শিশু-যাদের ভবিষ্যৎ বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠছিল-তা এখন প্রশ্নের মুখে। এখন কে চালাবে সংসার, কে দেখবে তাদের পড়াশোনা, কে দিবে নিরাপত্তা-এই দুশ্চিন্তাই পরিবারটির প্রতিটি মুহূর্ত গ্রাস করে আছে।
খোকন দাসের স্ত্রী সীমা রানী দাস গৃহিণী। তাদের তিন সন্তান-আকাশ (১৫), বিকাশ (১০) ও আদর (৫)।
একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি কে হারিয়ে পরিবারটির জীবনের সবকিছুই যেন এক মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেছে। যে মানুষটিকে ঘিরে ছিল পরিবারের সব স্বপ্ন আর আশা, যে ছিল সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। তার ছোট দোকানটিই ছিল পরিবারের শেষ সম্বল ও বেঁচে থাকার ভরসা। কিন্তু নির্মম হত্যাকাণ্ডে খোকনকে হারানোর পর সেই দোকানও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে, ফলে পরিবারটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
শনিবার (৩ জানুয়ারী) সকালে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর রাত ১০টার দিকে নিজ বাড়ির সামনেই খোকন দাসের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
স্বজনরা জানান, শনিবার (৩ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর রাত সাড়ে আটটার দিকে লাশবাহী গাড়ি তিলই গ্রামে পৌঁছায়।
খোকন দাসের মেঝো বোন অঞ্জনা রানী দাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার ভাই খোকন ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল ও ভদ্র প্রকৃতির মানুষ। তিনি কখনও কারও সঙ্গে ঝামেলা বা বিরোধে জড়াননি। সংসার চালাতে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন, শুধু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই।
তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের তিনটি ছোট সন্তান রয়েছে। আজ সে নেই, এখন ওদের কী হবে, কোথায় যাবে, কীভাবে থাকবে, কী খাবে—এই প্রশ্নগুলো আমাদের কাঁপিয়ে দিচ্ছে।’
নিহত খোকনের পিতা পরেশ চন্দ্র দাস জানান, পরিবার নিয়ে এখন কোথায় দাঁড়াবেন, কীভাবে সংসার চালাবেন-তা ভেবেই তিনি দিশেহারা। প্রতিদিনের খাবার থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষা, সবকিছুই এখন প্রশ্নের মুখে।
স্ত্রী সীমা রানী দাস কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমার স্বামীকে ওরা পুড়িয়ে মেরেছে। তিন দিন হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখেছি। শরীরের রক্ত ঝরে ঝরে শেষ হয়ে গেছে। সেই দৃশ্য আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।’
পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে খোকন দাস ছুরিকাঘাতের শিকার হন। হামলাকারীদের চিনে ফেলায় তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তার চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারী) দুপুরে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। মৃত্যুর সঙ্গে তিন দিন লড়াই করে শনিবার (৩জানুয়ারী) সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর রবিবার (৪ জানুয়ারি) কনেশ্বর এলাকার সোহাগ খান, রাব্বি মোল্যা ও পলাশ সরদারকে গ্রেপ্তার করে র ্যাব।
র্যাবও দাবি করেছে, গ্রেপ্তার তিনজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। রবিবার সন্ধ্যায় র্যাব-৮-এর মাদারীপুর ক্যাম্পে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে র্যাব-৮-এর অধিনায়ক কমান্ডার শাহাদাত হোসেন জানান, ব্যবসার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়। প্রথমে তাকে ছুড়িকাঘাত ও পরে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ায় হত্যার জন্য খোকন দাসের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।বরিশাল র্যাব-৮ ও কিশোরগঞ্জ র্যাব-১৪-এর যৌথ অভিযানে কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার পূর্ব পৈলানপুর এলাকা থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে, সোমবার (৬ জানুয়ারি) শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার তিন আসামিকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। রবিবার (৫ জানুয়ারি) রাতে শরীয়তপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা আক্তার গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বপন মল্লিক গ্রেপ্তার হওয়া সোহাগ খান, রাব্বি মোল্যা ও পলাশ সরদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চান। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এ বিষয় ডামুড্যা থানার ওসি মোহাম্মদ রবিউল হক জানান, আসামিদের রিমান্ডে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। দুইদন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি পরিকল্পিত ছিনতাই ছিল। পরে আসামিদের চিনে ফেলায় হত্যার উদ্দেশ্যেই আগুন ধরানো হয়েছে খোকনের দেহে।
ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ সালাউদ্দিন আইয়ূবী বলেন, ‘খোকন চন্দ্র দাসের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সার্বিক সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। তারই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে নিহত খোকন দাসের সৎকার কার্যের জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে তার পরিবারকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে।’
ইখা