কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার খলিশাকোটাল সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক পাকা রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আপত্তি জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ।
গত বুধবার থেকে দফায় দফায় বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠকে বিজিবির কট্টর প্রতিবাদে নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ স্থগিত রেখেছে বিএসএফ।
এরপর গত বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টায় আবারও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খলিশাকোটাল সীমান্তে সড়ক নির্মাণকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে ঐ দিন বিকাল সাড়ে ৫ টায় দ্বিতীয় দফায় বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সীমান্তে বাংলাদেশের অংশে বিজিবি ও ভারতের অংশে বিএসএফ সদস্যদের সার্বক্ষণিক টহল জোড়দার করতে দেখা গেছে।
এদিকে শুক্রবার (৯ জানুয়ারী) ঐ সীমান্তে কোন ধরণের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি না থাকলে সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে আবারও নতুন করে উভয় দেশের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মেইন পিলার নং ৯৩৪ এর সাব পিলার ১ এসের পাশে তৃতীয় দফায় পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন লালমনিরহাট -১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীন শিমুলবাড়ী ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার নরেশ চন্দ্র রায় ও ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন কোচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ থানার ০৩ ব্যাটালিয়নের অধীন মেঘ নারায়ণের কুঠি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার এসি সুনীল কুমার। বৈঠকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) ১০ সদস্য ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফে ১০ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
বিজিবি সুত্রে জানা গেছে, খলিশাকোটাল সীমান্তের আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ৯৩৪ এর ১ নং সাব পিলার থেকে ১১ নং সাব পিলার পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার জায়গা কোচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ থানার করলা এলাকায় কুর্শাহাট-টু-দিনহাটা যাওয়ার প্রধান সড়ক। সীমান্তঘেষা ভারতীয় এই সড়কটির ১ কিলোমিটার জায়গা শুন্য লাইন থেকে কোথাও ৭০ গজ, কোথাও ৫০-৬০ গজ আবার কোথাও ১০০ থেকে ১২০ গজের মধ্যে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক সীমানা আইন অনুযায়ী শুন্য লাইন থেকে উভয় দেশের ১৫০ গজের মধ্যে কোন প্রকার পাকা স্থাপনা নির্মানের নিয়ম নেই। কিন্তু সেই আইন অমান্য করে বিএসএফ পাকা সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করে। এনিয়ে বিজিবি- বিএসএফের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় জনগন লাঠিসোঁটা নিয়ে বিজিবির সাথে অবস্থান নেয়।
সীমান্তবাসী ও সাবেক ইউপি সদস্য উমর আলী মন্টু জানান, গত তিন চার দিন থেকে সীমান্তঘেষা ভারতের অভ্যন্তরে ১ কিলোমিটার পরাতন সড়কটির পাশে পূর্ব দিকে নতুন করে পাকা সড়ক নির্মাণ করে আসছে ভারতীয় বিএসএফ। তারা রাতের-আধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিজিবি সদস্যরা বাধা ও কয়েক দফা বৈঠক হলেও ভারতীয় বিএসএফ সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধ করেনি। ফলে গত বৃহস্পতিবার বিকাল উত্তেজনা দেখা দিলে আমরা শতশত এলাকাবাসী বিজিবিকে সহযোগিতা করে রাস্তা নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। পরে বিকাল সাড়ে ৫ টার দিকে পতাকা বৈঠক হওয়ার পর সীমান্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত আমাদের সীমান্ত এলাকায় আগের মতো শান্তি ফিরেছে আমরা এখন স্বাভাবিক চলাফেরা করছি।
এ প্রসঙ্গে লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানান, খলিশাকোঠাল সীমান্তের জিরোলাইন থেকে ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের অংশে নতুন করে পাকা সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করলে বিজিবির পক্ষ থেকে কট্টর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক আইনে সুস্পষ্ট বলা আছে জিরোলাইন থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোন ধরণের পাকা স্থাপন করা যাবে না। বিএসএফ যে স্থানে পাকা সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার থেকে কোথাও ৫০ থেকে ৭০ গজ আবার কোথাও ৮০ থেকে ৯০ গজ দুরত্ব। এই কারণে বালারহাট ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা কট্টর প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে তৃতীয় দফা বিজিবি- বিএসএফের কোম্পানি পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে ওই সীমান্তে বিজিবির টহল জোড়দার করা হয়েছে এবং সীমান্তে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এসেছে।
তিনি আরও জানান আগামী ১৩ জানুয়ারী ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে ওই সীমান্তে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সে সময় পর্যন্ত বিএসএফ সড়ক নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে। বর্তমানে নির্মাণ কাজও বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার বিকালে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ শতাধিক সীমান্তবাসীদের সাথে সীমান্তে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে জনসচেতন মুলক আলোচনা সভা করেছেন।
এফএস