চারদিকে তেতুলিয়া নদীর জলরাশি, মাঝখানে একটি জনপদ—মুজিবনগর। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপচরে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ এত মানুষের জন্য নেই একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ক্লিনিক। অসুস্থ হলে নদী পেরোনোর লড়াই আর অনিশ্চয়তাই এখানে চিকিৎসার নাম।
৬ হাজার ৪৩৭ একর আয়তন বেষ্টিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর মুজিবনগর। এই চরটি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আওতাধীন। পুরো চরঘেরা তেতুলিয়া নদী। নদীপথে খেয়া পারাপারেই এখানকার বাসিন্দাদের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। চরের বাসিন্দারা জেলে পেশা ও কৃষি কাজে জড়িত। এই দ্বীপে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসতি হলেও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য একটি ক্লিনিকও নেই।
চরের বেশির ভাগ মানুষ জেলে ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্যখাতে চরম অবহেলার কারণে তাঁদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও এখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা নেই। ফলে সামান্য অসুখেও মানুষকে ঝাড়ফুঁক কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জরুরি রোগীদের জন্য চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়াই একমাত্র ভরসা। কিন্তু নদীপথে খেয়া পার হয়ে সেখানে যেতে হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর তীব্র স্রোত ও নৌযানের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও নেই।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক নারী ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
দ্বীপবাসীর অভিযোগ, বারবার জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একজন বাসিন্দা বলেন, ‘অসুস্থ হলে আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না।’
স্থানীয় বাসিন্দা ফজল মাঝি বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর ধরে মুজিবনগরে বসবাস করছি। এই দীর্ঘ সময়ে সরকার একটি ক্লিনিকও স্থাপন করেনি। মূল ভূখণ্ডে যেতে হলে নদী পার হতে হয়। গুরুতর অসুস্থ হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনছি।’
মুজিবনগরের বাসিন্দা বিবি কলছুম বলেন, ‘২০২৪ সালে গভীর রাতে আমার প্রসববেদনা ওঠে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও নদী পার হওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে একজন ধাত্রী দিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করাতে হয়।’
দ্বীপবাসীর দাবি, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ এত মানুষের বসবাস থাকা সত্ত্বেও একটি ক্লিনিক না থাকা চরম অবহেলার উদাহরণ।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মনির হাওলাদার বলেন, ‘দ্বীপটিতে দ্রুত একজন স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।’
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, ‘দেশের নাগরিক হিসেবে মুজিবনগর দ্বীপের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’
ইখা