ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় আয়মন নদীর একপাশে সিসি ব্লক নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নদীর পাড় সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের কাজ চলছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ২০-৬১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আয়মন নদীর এক পাড়ে সিসি ব্লক বসানোর কাজ করছেন শ্রমিকরা। এ সময় ব্লকের নিচে মানহীন ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকল্পটির শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি চোখে পড়েনি।
ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে জিওবি অর্থায়নে আয়মন নদীর একপাশে সিসি ব্লক নির্মাণ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এরমধ্যে ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা বিলও উত্তোলন করে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ প্রকল্পের আওতায় আয়মন নদীর ব্রিজ থেকে প্রায় ৬৮৮ মিটার এলাকায় সিসি ব্লক বসানো হচ্ছে। গত বছরের ১৬ এপ্রিল কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের ১৪ মে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে পার্টনার হিসেবে কাজ করছে উত্তম–তাপস নামে দু'জন স্থানীয় ঠিকাদার।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কাজের মান নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউসুফ ব্রাদার্সের প্রতিনিধি বিপ্লব চক্রবর্তী লিটন বলেন, “অনেক লোকসান দিয়ে কাজ করছি। তাই একটু-আধটু মান খারাপ হবেই। এটা নিয়ে নিউজ করার কী দরকার আছে?”
এদিকে, এলজিইডির কাজ না করেই বিল উত্তোলনের সঙ্গে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জড়িত—তাদের তালিকায় ইউসুফ ব্রাদার্সের নাম অতীতে উঠে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে একসময় প্রতিষ্ঠানটি কালো তালিকাভুক্তও হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের পরও প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে সরকারি কাজ পেয়ে যাচ্ছে।
এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রামভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স গত আট মাসে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে প্রায় ২৮০টি কাজ পেয়েছে, যার মোট দরমূল্য প্রায় ৮৩৬ কোটি টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পিরোজপুরের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য ছিল এই প্রতিষ্ঠান।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর মহিউদ্দিন মহারাজ দুবাইয়ে পালিয়ে গেলেও মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের আধিপত্য কমেনি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
আরও অভিযোগ আছে, প্রতিষ্ঠানটি নিজেরা সরাসরি কাজ না করে অধিকাংশ প্রকল্প বিক্রি করে দেয়। প্রতিটি জেলায় তাদের নির্ধারিত ঠিকাদার থাকে, যারা নির্দিষ্ট অঙ্কের চুক্তিতে ইউনুস ব্রাদার্সের লাইসেন্স ব্যবহার করে দরপত্র জমা দেয়। কেউ কেউ মনে করছেন, ইউনুস ব্রাদার্সকে সামনে রেখে পলাতক মহারাজই এখনো নেপথ্যে সক্রিয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাওর) নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, “সিসি ব্লকের কাজে অনিয়ম করার সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়ার পরদিনই ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিদর্শন করেছি, তখন বড় কোনো অনিয়ম পাইনি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে কোনোভাবেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার না করা হয়।”
স্থানীয়রা বলছেন, নদীভাঙন রোধে এই প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নমানের কাজ হলে অল্প সময়েই সিসি ব্লক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি এলাকাবাসীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর তদারকির দাবি জানিয়েছেন তারা।
এসআর