সমুদ্রের ঢেউ ঠিকই আগের মতো আছড়ে পড়ছে। আকাশও নীল, বাতাসেও লবণাক্ত সোঁদা গন্ধ। কিন্তু কক্সবাজারে নেই সেই চেনা কোলাহল, নেই পর্যটকের উচ্ছ্বাস। লাবণী থেকে কলাতলী—বিস্তীর্ণ বালুচর যেন হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে ৮২ ঘণ্টার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটননগর এখন অস্বাভাবিক নীরবতায় আবদ্ধ—ঢেউ আছে, মানুষ নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের জারি করা ৮২ ঘণ্টার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যত পর্যটননির্ভর এই শহরকে থামিয়ে দিয়েছে।
-698c0de3858b7.webp)
নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে কেউ নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করতে পারবেন না। ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এ বিধিনিষেধ বলবৎ থাকবে বলে নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম। তিনি জানান, নির্বাচন নির্বিঘ্ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে কোনো হোটেল বা মোটেল পর্যটকদের কক্ষ ভাড়া দিতে পারবে না। ফলে দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্রটি যেন হঠাৎ করেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
সরেজমিনে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, বছরের অধিকাংশ সময় যেখানে পা ফেলার জায়গা থাকে না, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ বালুচর প্রায় ফাঁকা। ঢেউ আগের মতোই আছড়ে পড়ছে, কিন্তু তা দেখার মানুষ হাতে গোনা।
শহরের আলীরজাঁহালের বাসিন্দা কাইছার ইসলাম বলেন, সাধারণ সময়ে সৈকতে দাঁড়ানোই দায়। এখন দেখে মনে হচ্ছে অন্য কোনো নির্জন সমুদ্রতট। স্থানীয়দের কেউ কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন, তবে বাইরের জেলা থেকে আগত পর্যটকের দেখা নেই বললেই চলে।
কলাতলী পয়েন্টে কয়েকজন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তানভীর রহমান জানান, বছরের বেশির ভাগ সময় সৈকতজুড়ে মানুষের ভিড় থাকে। কিন্তু নির্বাচনের এই সময়ে সৈকত প্রায় জনশূন্য। এমন নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগের সুযোগ খুব কমই মেলে, তাই তারা এসেছেন একটু অন্যরকম কক্সবাজার দেখতে।
হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসার পর থেকেই বুকিং বাতিলের হিড়িক পড়েছে। অনেকেই অগ্রিম দেওয়া অর্থ ফেরত চেয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যে হোটেল-মোটেলগুলো দৈনিক লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে।
শুধু আবাসন খাত নয়, পরিবহন ব্যবসায়ী, রেস্টুরেন্ট মালিক, বিচের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার থেকে শুরু করে ট্যুর অপারেটর—সবাই একই সংকটে পড়েছেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কক্সবাজারের অর্থনীতি সরাসরি পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল। এমন দীর্ঘ সময়ের পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শুধু সাময়িক নীরবতা নয়, বহু মানুষের জীবিকায় টান ফেলেছে। নির্বাচনের স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা মানলেও তারা বলছেন, এই সময়টা তাদের জন্য একপ্রকার অচলাবস্থা।
একদিকে ভোটের প্রস্তুতি, অন্যদিকে থমকে যাওয়া পর্যটন শহর—৮২ ঘণ্টার এই বিরতি কক্সবাজারকে দেখাল এক ভিন্ন চেহারা। কোলাহলহীন, জনশূন্য, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে চাপের মুখে থাকা এক সমুদ্রনগরী। এখন অপেক্ষা, নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার কবে ফিরবে সেই চেনা ভিড়, সেই প্রাণচাঞ্চল্য।
ইখা