ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী ঢাকার ২০টি আসনই ছিল সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আলোচিত। অধিকাংশ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, নাটকীয়তা এবং অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে ফল ঘোষণা হয়েছে।
বিশেষ করে ঢাকা-৮, ঢাকা-৪, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৪ ও ঢাকা-১৬ আসন ঘিরে ছিল ব্যাপক আলোচনা। শুধু সরকার গঠনের সমীকরণ নয়, এই আসনগুলোতে ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, ভোটের দিনের উত্তেজনা এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা নির্বাচনের স্বাভাবিক দৃশ্যকে আরও ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। তবে বিশেষ কিছু আসনে ‘কূলে এসে তরী ডোবা’র ঘটনা ঘটে, যেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এগিয়ে থাকা প্রার্থীর জয় নিশ্চিত হয়নি।
বেসরকারি ফলাফলের ভিত্তিতে দেখা যায়, ঢাকার অধিকাংশ আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী। উল্লেখযোগ্য বিজয়ীরা হলেন-ঢাকা-৮ এ মির্জা আব্বাস, ঢাকা-৬ এ ইশরাক হোসেন। এছাড়া কিছু আসনে জামায়াতে ইসলামীও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ঢাকা-১৪ এ মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জয়ী হয়েছেন। ঢাকা-৪ এবং ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও জয়ী হন।
ঢাকা-১৫ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ২০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফলে এ তথ্য জানানো হয়। জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে মোট কেন্দ্র ১২৭টি। এ আসনে তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ৮২ হাজার ৬৪৫, আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৬১ হাজার ৯২০ ভোট। জামায়াত আমির এখানে ২০ হাজার ৭২৫ ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করেছেন।
ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান (ধানের শীষ প্রতীক) বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামানকে (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) ৫ হাজার ভোটে পরাজিত করেন তিনি।
ঢাকা-১১ আসনে জয় পেয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ভোরে আসনটির ১৬৩ কেন্দ্রের মধ্যে ১৬২টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, শাপলা কলি প্রতীকে নাহিদ ইসলাম পেয়েছেন মোট ৯৩ হাজার ৮৭২টি ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী এম. এ. কাইয়ুম মোট ৯১ হাজার ৮৩৩টি ভোট পেয়েছেন।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর অন্যতম ছিল ঢাকা-৮। ভোটগ্রহণ, গণনা ও ফল ঘোষণা ঘিরে উত্তেজনা, অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগ এবং নাটকীয় পরিস্থিতির পর শেষ পর্যন্ত বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে রিটার্নিং অফিসার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী পোস্টাল ব্যালটসহ ১০৯টি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করেন। এতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মির্জা আব্বাস পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৩৬৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ৫৪ হাজার ১২৭ ভোট। বহুল আলোচিত ঢাকা-৮ আসনে ভোটগ্রহণ ও গণনাকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে একটি ভোটকেন্দ্রে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়, তবে দিনভর উত্তেজনায় ছিল এ আসন।
ঢাকা-৪ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর জয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন। দিনভর উত্তেজনা ও সমানে সমান লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত তিনি বিজয় নিশ্চিত করেন।
ঢাকা-১৩ আসনে ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে মধ্যরাতে নির্বাচন কমিশনে যান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে তিনি আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানান। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যাচাইয়ের আশ্বাস দেয়া হয়।
মোহাম্মদপুর-আদাবর-শ্যামলী নিয়ে এই আসনে মামুনুল হককে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। তিনি পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৮৭টি ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মামুনুল হক পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৭টি ভোট। তাদের ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ৩২০।
ঢাকা-১৪ (মিরপুর) আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ১১৩ ভোট। এ আসনেও প্রচারপর্ব থেকে শুরু করে ভোটের দিন পর্যন্ত ছিল বাড়তি নজর।
ঢাকা-১৬ আসনের ১৩৭টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আব্দুল বাতেন ২ হাজার ৬১৬ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এখানেও ছিল টানটান উত্তেজনা।
রাজধানীর এই আসনগুলোতে ভোটাররা স্থানীয় সমস্যা, চাঁদাবাজি, যানজট, দুর্নীতি এবং সেবার বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে নজর কাড়ে, যা ফলাফলের প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে।
কূলে এসে তরী ডুবল কাদের: কয়েকটি আসনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এগিয়ে থাকা প্রার্থীর জয় নিশ্চিত হয়নি। ঢাকা-৮ এ জাতীয় নাগরিক পার্টির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী শেষ পর্যন্ত ব্যবধান কমিয়ে আনলেও বিজয় ছিনিয়ে নিতে পারেননি।
ভোটের দিন কিছু কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। ঢাকা-৮ এবং ঢাকা-১৩ এ বিশেষভাবে এটি নজর কাড়ে। বিএনপি ও এনসিপি সমর্থকেরা কার্যালয় ও ভোটকেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেন। তবে নির্বাচনি কর্মকর্তারা পরিস্থিতি শান্ত করতে সচেষ্ট ছিলেন।
রাজধানীর ২০টি আসনের ফলাফল শুধু সরকার গঠনের হিসাব নয়, বরং নগর রাজনীতির ভবিষ্যৎও এই ফলাফলের কারণে প্রভাবিত হয়। ভোটাররা তাদের দাবির মাধ্যমে রাজনৈতিক ইস্যুতে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। বিশেষ করে নগর রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, সেবা ও স্থানীয় সমস্যার সমাধানকে গুরুত্ব দিতে হবে-এটি নির্বাচিত প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, ঢাকা-২০ আসনের ফলাফল রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়। রাজধানীর এই নির্বাচনি লড়াই ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
এবি