শীত আর হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে বোরো ধান আবাদ ও রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। বিস্তীর্ণ হাওরের মাঠজুড়ে চলছে বোরো আবাদ। ভোরের আলো ফোটার আগেই কোমর বেঁধে ফসলের মাঠে নেমে পড়ছেন তাঁরা।
কুয়াশায় ঢাকা শীতের সকালে বীজতলায় ধানের চারা পরিচর্যার পাশাপাশি জমি চাষের কাজ চলছে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কৃষকের এমন পরিশ্রমে হাওরে ফলে সোনার ফসল। তবে এই ফসল ফলানোর মাঝেও হতাশা পিছু ছাড়ছে না তাঁদের। প্রতিবছর আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির মুখে পড়েন হাওরের কৃষকেরা। তখন মহাজনের দেনা শোধ করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তাঁরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজেল, সার ও বীজসহ সব কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি। এতে বোরো চাষের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে বলে জানান কৃষকেরা। তারপরও আহার জোগাতে প্রধান ফসল বোরো ধান রোপণে ব্যস্ত তাঁরা।
হাওরে এখন বোরো ধান রোপণের ভরা মৌসুম। এই সময়ে চাষাবাদে পিছিয়ে পড়লে আসন্ন বৈশাখে ঘরে ঘরে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। সারা বছর খাদ্যের টান সামলাতে হবে হাওরবাসীকে। তাই শীত যত বাড়ছে, কৃষকের ব্যস্ততাও তত বাড়ছে। প্রাকৃতিকভাবেই তাঁরা নিজেদের এভাবে প্রস্তুত করেছেন। বিস্তীর্ণ হাওরের কৃষকদের চিরায়ত স্বভাবই হলো—প্রতিকূলতা জয় করে মাঠে নেমে পড়া। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঘন কুয়াশা কিংবা পৌষ–মাঘের হাড়কাঁপানো শীত—কোনোটাই তাঁদের নিবৃত্ত করতে পারেনি। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বোরো উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা বেশি বলে জানান কৃষকেরা।
চাষিদের অভিযোগ, সার কিনতে গেলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সংকটের কথা বলেন। তবে বেশি দাম দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ডিলার দোকানে মূল্যতালিকা টাঙালেও সেই দামে বিক্রি করছেন না। কোথাও তালিকায় সারের মূল্যই লেখা নেই। কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের রসিদ দেওয়া হলেও বাড়তি দাম রসিদে লেখা হয় না। প্রতিবাদ করলে সার বিক্রি না করার হুমকিও দেওয়া হয়।
অন্যদিকে সার ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কম থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, গুদাম থেকে যে পরিমাণ সার পাওয়া যাচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় কম।
কৃষকেরা জানান, তাঁদের জমিতে স্থানীয় জাত, উফশী ও হাইব্রিড—সব ধরনের ধান চাষ হচ্ছে। তবে এবার উফশী ধানের আবাদ বেশি। এক ফসলি এই হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন–জীবিকার একমাত্র ভরসা বোরো ধান। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এখানকার ধান জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। কিন্তু দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা ঋণ ও দাদনে চাষ করে অধিকাংশ ফসল দায় শোধে হারান। ফলে ফসল তোলার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের গোলা ফাঁকা হয়ে যায়।
সরেজমিনে হাওরে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নেমে পড়েছেন কৃষকেরা। বীজতলায় চারা পরিচর্যা, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ, শ্যালো মেশিনে পানি সেচ—সবকিছুই চলছে একসঙ্গে। কোথাও কচি চারার সবুজ গালিচা, কোথাও চারা তোলা ও রোপণের কাজ। শীত যেন তাঁদের স্পর্শই করছে না।
ইটনা উপজেলার ধনপুর গ্রামের কৃষক হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘জমি প্রস্তুতের জন্য নন-ইউরিয়া সার দরকার। সময়মতো সার না পেলে চাষ করা যায় না। কৃষি অফিস জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। ডিলারদের কারসাজি ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে তদারকি নেই।’
মিঠামইন উপজেলার চারিগ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম রতন বলেন, ‘চারা আর সারের দামেই আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে। এর ওপর সেচ দিতে গেলে বিদ্যুৎ থাকে না।’
অষ্টগ্রামের বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের লাউড়া গ্রামের কৃষক মোস্তফা বলেন, ‘ঘন কুয়াশা আর প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও কাদাপানিতে কাজ করতে হয়। বোরোই আমাদের একমাত্র ফসল। এবার ৬ একর জমিতে চারা রোপণ করছি। খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বেশি দাম না দিলে সার পাওয়া যায় না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের তিন উপজেলা—ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে চাষ হবে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উৎপাদন হবে। জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কেউ বাড়তি দামে সার বিক্রি করলে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইখা