পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল সেন্টমার্টিন দ্বীপে আবারও কেয়াবন উজাড়ের অভিযোগ উঠেছে। দ্বীপের দক্ষিণপাড়া সমুদ্রসৈকত এলাকায় সারি সারি কেয়া গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উপকূল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই প্রাকৃতিক বেষ্টনী ধ্বংস হলে দ্বীপের ভৌগোলিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।
গত শনিবার বিকেলে দক্ষিণপাড়া সৈকত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যেখানে একসময় ঘন কেয়াবন ছিল, সেখানে এখন ফাঁকা বালুচর ও কাটা গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে। স্থানীয়দের দাবি, সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণপাড়া এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেয়া গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কারা বা কী উদ্দেশ্যে এ কাজ করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দক্ষিণপাড়ার জেলে আবদুস সালাম বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই কেয়াবনের ভেতর দিয়ে সাগরে গেছি। ঝড়ের সময় গাছগুলো ঢেউয়ের ধাক্কা অনেকটাই সামলে দিত। এখন যদি এগুলো না থাকে, বড় জলোচ্ছ্বাসে কী হবে—ভেবে ভয় লাগে।”
দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ জানান, সূর্যাস্ত দেখতে গিয়ে তিনি কাটা গাছের দৃশ্য দেখেন। তার ভাষ্য, “ঘন কেয়াবন ছিল জায়গাটায়। এখন শুধু কাটা গুঁড়ি পড়ে আছে। মনে হয়েছে, দ্বীপের বুক থেকে সবুজের একটি অংশ তুলে নেওয়া হয়েছে।”
উপকূলীয় পরিবেশে কেয়া গাছের গুরুত্ব তুলে ধরে স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা জানান, এই গাছ বালুচরকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ঢেউয়ের আঘাত কমায় এবং উপকূলভাঙন রোধে প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা আক্তার বলেন, “পর্যটকেরা কেয়াবনের ভেতর ছবি তুলত, শিশুরা খেলাধুলা করত। এখন জায়গাটা ফাঁকা ও নির্জন লাগছে। গাছ কাটা মানে শুধু পরিবেশ নয়, আমাদের জীবনযাত্রারও পরিবর্তন।”
পরিবেশকর্মী মাহমুদুল হক বলেন, “সেন্টমার্টিন রক্ষায় শুধু কাগুজে পরিকল্পনা নয়, মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি দরকার। নিয়মিত টহল, স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা ও প্রয়োজন হলে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা সভাপতি এইচ এম এরশাদ বলেন, “কেয়া গাছ উপকূলের রক্ষাকবচ। এগুলো কেটে ফেলা মানে দ্বীপকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা জাফর আলমের মতে, “প্রকৃতির সৌন্দর্যের জন্যই পর্যটকেরা এখানে আসেন। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু তা যেন পরিবেশ ধ্বংস করে না হয়।”
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। ঘটনাস্থলে প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করা গেলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, অতিরিক্ত পর্যটন চাপ, অবৈধ স্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা ও বনভূমি সংকোচনের কারণে সেন্টমার্টিন দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যেই কেয়াবন উজাড়ের ঘটনা দ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দ্বীপবাসীর দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে অবশিষ্ট কেয়াবন রক্ষা এবং উজাড় হওয়া এলাকায় পুনরায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে উপকূলের এই প্রাকৃতিক রক্ষাদেয়াল একসময় শুধুই স্মৃতি হয়ে যাবে।
ইখা