নদী বেষ্টিত দ্বীপ জেলা ভোলায় এখন আতঙ্কের নাম পানি ডুবে শিশু মৃত্যু। প্রতিবছর এ জেলায় অসংখ্য শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বরিশাল বিভাগে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ, যার মধ্যে ভোলা অন্যতম।
গত ৬ জানুয়ারি দুপুরে ভোলার মনপুরায় পুকুরে পানিতে ডুবে আরিশা নামের দুই বছর বয়সী এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এছাড়াও ৩ বছর আগে একই পরিবারের দুই শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। পানিতে ডুবে একই পরিবারের ৩ শিশুর মৃত্যুতে নেমে আসে শোকের ছায়া।
সেই শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত করে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু ঠেকাতে 'চাইল্ড সেফটি ডিভাইস' নামের একটি ডিভাইস উদ্ভাবন করেছেন ওই পরিবারের তাহসিন নামের এক তরুণ।
তাহসিনের উদ্ভাবিত ডিভাইসটি দেখতে অনেকটা লকেটের মত যার ওজন মাত্র দুই গ্রাম। এটি শিশুর গলায় ঝুলে থাকবে যা জীবনরক্ষাকারী লকেট হিসেবে কাজ করবে। শিশু অসাবধানতাবশত পুকুরের পানিতে পড়ে ডুবে গেলে ওই ডিভাইসের মাধ্যমে শিশুর মায়ের ফোনে যাবে কল, বাজবে সাইরেন। সাইরেন বাজার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে দেখা যাবে শিশুটি পড়ে যাওয়া পুকুরের লোকেশন। দ্রুত উদ্ধার করে বাঁচানো যাবে শিশুর জীবন।
তাহসিন ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনার চর গ্রামের ক্বারী আব্দুল হালিম মিয়ার ছেলে। সে ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অফ ইন্জিনিয়ারিং এ্যান্ড টেকনোলজি কলেজের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র। তার বাবা ক্বারী আব্দুল হালিম স্থানীয় একটি মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক। পিতার সার্বিক সহায়তা ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন উদ্ভাবনী কাজে যুক্ত তাহসিন।
তাহসিন সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, কয়েক বছর আগে তার আপন দুই খালাতো বোন বাড়ির পাশের একটি পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায়। ঘটনাটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই শোক থেকেই চিন্তা করেন শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে খোঁজেন একটি কার্যকরী সমাধান। প্রায় আট থেকে নয় মাস গবেষণার পর তিনি ডিভাইসটি তৈরি করতে সক্ষম হন। যার নাম দিয়েছেন 'চাইল্ড সেফটি ডিভাইস'।
তাহসিন আরও বলেন, শিশুর সঙ্গে থাকা ডিভাইসটি পানির সংস্পর্শে এলেই ঘরে থাকা একটি রিসিভারে সিগনাল পাঠাবে। তখন সেখানে সাইরেন বেজে উঠবে।একই সঙ্গে অভিভাবকের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল যাবে। অভিভাবক চাইলে জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুটি কোথায় পানিতে পড়েছে সেই অবস্থানও জানতে পারবেন।
ডিভাইসটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে তাহসিন জানান, পানির সংস্পর্শে এলে পানিতে থাকা মুক্ত ইলেকট্রন সামান্য বিদ্যুৎ পরিবহন করে সুইচের মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে রিসিভারে সংকেত পৌঁছে যায় এবং সতর্কতা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়।
তাহসিন সময়ের কন্ঠস্বরকে আরও জানায়, চাইল্ড সেফটি ডিভাইসটি তৈরি করতে তার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা গেলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে বাজারে আনা সম্ভব হবে।
তাহসিনের বাবা ক্বারী আব্দুল হালিম বলেন, ছোট বেলা থেকে তাহসিন বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নিয়ে গবেষণা করে আসছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তার ছেলে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু রোধে একটি কার্যকরী ডিভাইস আবিস্কার করেছেন। যেটি ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ছেলের এমন ডিভাইস আবিস্কারে তিনিও খুব খুশি। তবে তার ডিভাইসটি বানিজ্যিকভাবে বাজারে আনার জন্য স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
তাহসিনের এই উদ্ভাবনকে স্বাগত জানিয়ে তার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে ভোলা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, তাহসিনের ডিভাইসটি বাজারে আনার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগীতা করা হবে।
ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, ছোট একটি ডিভাইসে শিশুর প্রাণ রক্ষাপাবে এটা সত্যিই অভাবনীয়। ডিভাইসটি ভোলাসহ সারাদেশে বানিজ্যিকভাবে বাজারে আনার জন্য তাহসিনকে সর্বাত্নক সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ, ইতোমধ্যে তার তৈরি ১৫টি প্রজেক্ট বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক পুরস্কারও অর্জন করেছেন তাহসিন।
আরডি