ফিলিস্তিনের আবরুদ্ধ গাজার ওমর হালাওয়া প্রায়ই ভুল করে বসে। ও ভুলে যায় যে ওর একটা পা নেই। আনমনে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যায়। ওমর খুব করে ফুটবল খেলতে চায়। কিন্তু পারে না। উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায় ওদের শিবিরের পাশেই কবর দেওয়া হয়েছে ওর কাটা পা।
ওমর নিয়ম করে প্রতিদিন একবার সেখানে যায়। অনেকক্ষণ বসে থাকে। কখনও তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ওর এখন আর আফসোস হয় না। বরং হতাশা কাজ করে, ঘৃণা ধরে গেছে। আল জাজিরাকে অকপটে ওমর বলেছিল, ‘আমার আগেই আমার পা জান্নাতে চলে গেছে।’
সবার মতো সেদিন খাবার পানি আনতে ছুটেছিল ওমর। ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চলছিল। সবার মতো ওমর নিজেকে নিরাপদ ভেবে দুপায়ে দিয়েছিল লম্বা ছুট। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা সামনে অপেক্ষা করছিল। তিন মাস আগে ওমর তার ডান পা হারায়। ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর। যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইসরাইল তখন স্থল হামলা চালাচ্ছিল।
উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায় ওমরদের শিবিরের কাছে একটি পানির ট্যাঙ্কার এসেছিল। পানি আনতে রাস্তায় বের হয়েছিল ওমর, তার ১১ বছরের বোন লায়ান, ১৩ বছরের চাচাতো ভাই মোয়াথ হালাওয়া এবং তার সমবয়সী বন্ধু মোহাম্মদ আল সিকসিক। মুহূর্তেই সব অন্ধকার। ইসরাইলি বাহিনী তাদের বর্বরতা তাদের চোখের আলো কেড়ে নিতে যাচ্ছে।
ওমর খুবই সৌভাগ্যবান, মারা যায়নি। ওর বোন আরও ভাগ্যবান, তারও কিছু হয়নি। ওমরের মা ইয়াসমিন হালাওয়া বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরেই ওমর প্রথম জানতে চেয়েছিল তার বন্ধু ও চাচাতো ভাই কেমন আছে।’ কিন্তু ওরা ওমরের মতো ভাগ্যবান ছিল না, ‘তারা দুজনই নিহত হয়েছিল।’
আল জাজিরা যখন তাদের কাছে গিয়েছিল তখন ওমর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াতে গিয়েছিল। কিন্তু ও একটি ভয়াবহ সত্য ভুলে গিয়েছিল—তার আর একটি পা নেই। ইয়াসমিন হালাওয়া বলেন, ‘সে চেয়ার থেকে পড়ে যায়। ওকে এমন অবস্থায় দেখতে আমাদের জন্য খুব কষ্টের।’
ওমরের মা ইয়াসমিন জানান, তাদের কাছে অত অর্থ নেই। তাই বাধ্য হয়ে উত্তরেই আছেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই গণহত্যামূলক যুদ্ধে আমরা অন্তত ১৫ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছি।’
এই গল্পে ওমর শুধু একটি চরিত্র। এমন হাজারো ওমরের জীবন দুর্বিষহ করে রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী। লায়ান ক্ষতি ছাড়া বেচে ফিরলেও ট্রমা পেছন ছাড়েনি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ইসরাইলি বর্বরতায় ২০২৩ সালে জানালার কাঁচ ভেঙে আহত হন লায়ান। ইয়াসমিন বলেন, ‘ওই বিভীষিকাময় রাতের পর আমরা সাদা কাপড় উঁচিয়ে ঘর ছাড়ি, যাতে ইসরাইলি সেনারা গুলি না করে। আমি চার বছরের হাতেমকে কোলে নিয়ে হাঁটছিলাম, পাশে ছিল ওমর ও লায়ান। পথে তারা তাদের আট বছরের এক চাচাতো ভাইয়ের মাথাছাড়া দেহসহ আরও অনেক শহীদের মরদেহ দেখে। তারা আতঙ্কে জমে যায়, চিৎকার ও কান্নায় ভেঙে পড়ে।’
এই ঘটনার পর থেকেই ইয়াসমিনের সন্তানরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। লায়ান আবার বিছানায় প্রস্রাব করতে শুরু করেছে। ওমর সবসময় ভয়ে থাকে—এমনকি চেয়ার পড়ার শব্দেও সে চমকে ওঠে।
ওমর ও লায়ান গাজার সেই লক্ষাধিক শিশুর একজন, যারা ইসরাইলি গণহত্যার ভয়াবহ ক্ষত শরীর ও মনে বহন করে চলছে। এই যুদ্ধে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ২০ হাজারই শিশু। আহত হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার শিশু, যাদের অর্ধেকের জীবন চিরতরে বদলে গেছে।
বর্তমানে গাজায় অন্তত ৩৯ হাজার শিশু এক বা উভয় অভিভাবককে হারিয়েছে। আধুনিক ইতিহাসে এর চেয়ে এতিম সংকট আর নেই বুঝি!
ইউনিসেফের মুখপাত্র কাজেম আবু খালাফ বলেন, ‘শৈশব উপভোগ করার বদলে ফিলিস্তিনি শিশুরা শিশুদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গায় বসবাস করছে। যুদ্ধবিরতির পরও ৯৫ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে।’ তিনি জানান, চার হাজারের বেশি শিশু এখনই চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে নেওয়ার প্রয়োজন।
ওমরের মতোই ১৩ বছরের রহাফ আল নাজ্জারও অপুষ্টি ও আঘাত নিয়ে বেঁচে আছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর-পশ্চিম গাজার সুদানিয়া এলাকায় খাবার আনতে গিয়ে ইসরাইলি কোয়াডকপ্টারের গুলিতে তার দুই পা বিদ্ধ হয়।
তার মা বুথাইনা আল নাজ্জার জানান, ‘সে ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। সপ্তাহে মাত্র চারটি ডিম জোগাড় করতে পারি। মাংস বা মুরগি কেনার সামর্থ্য নেই। কখনো কখনো তার ভাইবোনদের না জানিয়ে তাকে একটি ফল এনে দিই।’
শীতের কারণে রহাফের যন্ত্রণা আরও বেড়েছে। অসহায় কণ্ঠে রহাফ বলে, ‘ঠান্ডা দিনে আমার পায়ে বিদ্যুতের শকের মতো ব্যথা হয়। ঘুমাতে ওষুধ খেতে হয়।’ রফাহ ওর বাবাকে মরতে দেখেছে। ওই কষ্ট এখনও ভুলতে পারছে না সে। রফাহর মা বলেন, ‘সে তার আহত বাবার কাছে হামাগুড়ি দিয়ে যায়, তাকে টেনে তাবুর ভেতরে আনে। বাবা তখনও জীবিত ছিলেন। বলেছিলেন—‘শক্ত হও, মা’কে সালাম দিও।’ তারপর তার কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস নেন।’
রহাফ বলে, ‘ক্ষুধা বা ব্যথা হলে বাবাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। আমি আবার স্কুলে যেতে চাই। ছবি আঁকা আর খেলাধুলা খুব মিস করি।’
গাজার শিক্ষা বিভাগের পরিচালক জাওয়াদ শেখ-খলিল বলেন, ‘এই যুদ্ধে আমরা ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী হারিয়েছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৯০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
তিনি জানান, এখন প্রায় ৪০০টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র—মূলত তাবু চালু আছে, যেখানে ১ লাখ ৫০ হাজার শিশু পড়ছে। কিন্তু খাতা, কলম, চক—কিছুই ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরাইল। ইউনিসেফও শিশুদের আবার পড়াশোনায় ফেরাতে বিশেষ কর্মসূচি চালু করছে।
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বাহজাত আল আখরাস বলেন, ‘দুই বছর স্কুল থেকে দূরে থাকা শিশুদের মানসিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
তিনি জানান, ট্রমায় আক্রান্ত শিশুরা অনেক সময় চুপচাপ হয়ে যায়, কেউ আবার আক্রমণাত্মক বা অস্থির হয়ে পড়ে। অনেকের স্মৃতিভ্রংশ, মনোযোগের সমস্যা বা বিছানায় প্রস্রাবের প্রবণতা দেখা যায়।
ওমরও সেই ট্রমার শিকার। তার মা ইয়াসমিন বলেন, ‘তার চুল পড়ছে, রাতে ঘুমাতে পারে না। দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে ওঠে, মনে করে পা ফিরে পেয়েছে—তারপর আবার ব্যথায় কাঁদে।’
ওমর বলে, ‘এক পা নিয়ে টয়লেটে যেতেও কষ্ট হয়। সবজি বহন করতে পারি না, পড়ে যাই।’ তবু তার স্বপ্ন আছে। সে বলে, ‘যখন কৃত্রিম পা পাব, তখন প্রথমেই ফুটবল খেলব আর সমুদ্রে সাঁতার কাটব। আমি সাঁতার খুব ভালোবাসি।’
এমআর-২