ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট চলাকালে দিনাজপুর-৪ (খানসামা–চিরিরবন্দর) আসনের খানসামা উপজেলায় ভোটের গোপনীয়তা ভেঙে সিল মারা ব্যালটের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনা ঘটছে। পছন্দের প্রার্থীর প্রতি সমর্থন দেখাতে গিয়ে একাধিক ভোটার গোপন বুথে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ছবি তুলে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন—যা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে আলোচনা ও সমালোচনা।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে ভোটগ্রহণ শুরুর পরপরই কয়েকজন ভোটারের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি ও বিভিন্ন গ্রুপে সিল দেওয়া ব্যালটের ছবি দেখা যায়। কিছু পোস্টে ভোটকেন্দ্রের ভেতরের পরিবেশ, ব্যালট হাতে সেলফি এবং ভোট দেওয়ার মুহূর্তের দৃশ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ছবিতে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা প্রতীকে সিল দেওয়ার দৃশ্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট দেওয়ার চিত্রও সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা গোপন বুথে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার পর মোবাইল ফোনে সেই ব্যালটের ছবি তোলেন। পরে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, প্রার্থী বা দলের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন প্রকাশ করতেই তারা এমনটি করেছেন। একজন ভোটার বলেন, “আমি কাকে ভোট দিলাম, সেটা দেখাতে চেয়েছি। এতে দোষের কিছু দেখছি না।
তবে সাধারণ ভোটারদের একটি অংশ বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভোট সম্পূর্ণ গোপন বিষয়। এভাবে ছবি দিলে অন্যদের ওপর প্রভাব বা চাপ তৈরি হতে পারে। আরেকজন বলেন, এটি নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন। প্রশাসনের উচিত কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া।
নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী, গোপন বুথে মোবাইল ফোন ব্যবহার, সিল মারা ব্যালটের ছবি তোলা কিংবা তা প্রকাশ করা আইনবিরোধী। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা আছে, ভোটার যেন স্বাধীন ও নির্ভয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণে শিথিলতার সুযোগে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খানসামা উপজেলার কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের অনেকেই মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করছেন। কিছু কেন্দ্রে প্রবেশপথে মোবাইল জমা দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা সব ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে মানা হয়নি। ফলে গোপন বুথে প্রবেশের পর কেউ কেউ ছবি তুলে তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করছেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভোটারদের স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে কোনো প্রার্থী বা প্রভাবশালী পক্ষ যদি ভোটের প্রমাণ হিসেবে ছবি দিতে চাপ সৃষ্টি করে, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
ভোটকেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছে। তবুও মোবাইল ফোন ব্যবহারে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি ভোটারদের আইন মেনে চলা এবং ভোটের গোপনীয়তা রক্ষার আহ্বান জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রচারের প্রবণতা যতই বাড়ুক, নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন—ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রত্যেক ভোটারের দায়িত্ব। সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব।
পিএম