ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত পূর্ণাঙ্গ ফলাফলে জেলার চার আসনেই ধানের শীষের প্রার্থীরা এগিয়ে থেকে বিজয় নিশ্চিত করেছেন।
আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া চললেও জেলার রাজনীতিতে ইতিমধ্যে নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সব কেন্দ্রের ফল সমন্বয়ের কাজ শেষ হয়েছে। চারটি আসনের কোথাও পুনর্গণনার দাবি না উঠলেও কক্সবাজার-৪ আসনে পোস্টাল ভোট গণনার পর চূড়ান্ত বেসরকারি ফল ঘোষণা হবে।
চকরিয়া ও পেকুয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-১ আসনটি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রার্থিতা এ আসনকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব এনে দেয়। মোট ১৭৭টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ২০ হাজার ৫৬৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আবদুল্লাহ আল ফারুখ (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২৬ ভোট। ব্যবধান প্রায় ৯৫ হাজার ৮৪০ ভোট। এ আসনে ভোট গ্রহণের হার ছিল ৫৪ শতাংশ। গণনার শুরু থেকেই গ্রামাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে সালাহউদ্দিন আহমদ এগিয়ে ছিলেন বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। শহরাঞ্চলেও তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ধরে রাখতে সক্ষম হন।
চকরিয়ার এক বিএনপি কর্মী বলেন, আমরা শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। ভোটের দিন পরিবেশ শান্ত ছিল। মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় পর নিজ এলাকায় সক্রিয় অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ এ আসনে বড় প্রভাব ফেলেছে।
দ্বীপাঞ্চলে সাংগঠনিক সুবিধা কুতুবদিয়া ও মহেশখালী নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-২ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে বিএনপির আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ও জামায়াতের এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মধ্যে। মোট ১২৪টি কেন্দ্রের ফলাফলে আলমগীর ফরিদ পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ২৬২ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৬৩৪ ভোট। ব্যবধান ৩৫ হাজার ৬২৮। এ আসনে ভোট পড়েছে ৪৬ শতাংশ।
দ্বীপাঞ্চলের রাজনীতিতে সাধারণত প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ইউনিয়নভিত্তিক সমন্বয় এবং ভোটের দিন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, বিএনপির প্রার্থী ও তার সমর্থকেরা ওয়ার্ডভিত্তিক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে ছিলেন।
মহেশখালীর এক তরুণ কর্মী বলেন, আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে দায়িত্ব ভাগ করে কাজ করেছি। ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তুতির সুফল পেয়েছি।
সদর, রামু ও ঈদগাঁও নিয়ে গঠিত কক্সবাজার- ৩ আসনে ছিল সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা। মোট ১৯২টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপির লুৎফুর রহমান কাজল পেয়েছেন ১ লাখ ৮১ হাজার ৪৬০ ভোট। জামায়াতের শহীদুল আলম বাহাদুর পেয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৪ ভোট। ব্যবধান ২৮ হাজার ৪৬৬। এ আসনে ভোট গ্রহণের হার ছিল ৪৮ শতাংশ। শহর ও গ্রাম মিলিয়ে মিশ্র ভোটব্যাংক থাকায় ফল নির্ধারণে কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েকটি কেন্দ্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও অন্যত্র ব্যবধান ছিল স্পষ্ট।
রামুর এক সমর্থক বলেন, কিছু কেন্দ্রে খুব কাছাকাছি ছিল। তবে সামগ্রিকভাবে আমরা এগিয়ে ছিলাম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, শহরাঞ্চলে ভোটের সমীকরণ এবং গ্রামাঞ্চলে সংগঠনের উপস্থিতি মিলিয়ে কাজলের পক্ষে ফল গেছে।
উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৪ আসনটি বরাবরই জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও মানবপাচারের মতো ইস্যু এ আসনের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। মোট ১১৭টি কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৯৯৩ ভোট। জামায়াতের নুর আহমদ আনোয়ারী পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৯৮ ভোট। ব্যবধান ৩ হাজার ২৯৫।
উখিয়ার ৫৬টি কেন্দ্রে শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছেন ৬০ হাজার ১১ ভোট এবং টেকনাফের ৬১টি কেন্দ্রে ৬১ হাজার ৯৮২ ভোট। অন্যদিকে নুর আহমদ আনোয়ারী উখিয়ায় পেয়েছেন ৫৮ হাজার ৯৩১ এবং টেকনাফে ৫৯ হাজার ৭৬৭ ভোট। এ আসনে ভোট গ্রহণের হার ছিল ৫২ শতাংশ। গণনার সময় কয়েক দফা ব্যবধান কমে ও বাড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে এখনো পোস্টাল ভোটের ফল প্রকাশ হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রহণযোগ্য পোস্টাল ভোট রয়েছে ৩ হাজার ৮৬৬টি। এসব ভোট গণনার পর চূড়ান্ত বেসরকারি ফল ঘোষণা হবে। যদিও বর্তমান ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে আছেন।
উখিয়ার এক নেতা বলেন, এখানে লড়াই কঠিন ছিল। কিন্তু আমরা আশা হারাইনি।
গণনা কেন্দ্রগুলোর বাইরে রাতভর সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও স্লোগান, কোথাও করতালি শোনা যায়। জেলা শহর থেকে চকরিয়া, মহেশখালী, উখিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয়ে ভিড় দেখা গেছে।
টেকনাফের এক কর্মী বলেন, অনেক দিন পর ভোটের দিন শান্ত ছিল। ফলাফল দেখে মনে হচ্ছে মানুষ মত দিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা বলেছেন, তারা ফলাফল বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষ করে কক্সবাজার-৪ আসনের পোস্টাল ভোট নিয়ে তাদের নজর রয়েছে। ভোটের হার ও রাজনৈতিক তাৎপর্য চারটি আসনের ভোট গ্রহণের হার ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কক্সবাজার- ১ এ ৫৪ শতাংশ, কক্সবাজার-২ এ ৪৬ শতাংশ, কক্সবাজার-৩ এ ৪৮ শতাংশ এবং কক্সবাজার–৪ এ ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছে।
সামগ্রিকভাবে গড় ভোটহার মাঝারি পর্যায়ে থাকলেও বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার জেলা দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও শরণার্থী ইস্যু এখানে বড় ভূমিকা রাখে। চারটি আসনেই একই দলের জয় জেলা রাজনীতিতে একধরনের একক প্রভাব তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, এ ফল শুধু সাংগঠনিক শক্তির প্রতিফলন নয়। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় ইস্যুতে অবস্থান এবং ভোটের দিনের ব্যবস্থাপনাও প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পোস্টাল ভোট গণনা ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপর নবনির্বাচিত সদস্যরা শপথ নেবেন। তবে বেসরকারি ফলাফলে যে চিত্র স্পষ্ট হয়েছে, তাতে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, এই ফল জাতীয় রাজনীতিতে কী বার্তা দেয় এবং জেলার উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে নতুন প্রতিনিধিরা কী ভূমিকা রাখে।
এসআর