যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের (জগহাটি) যুবদল নেতা রফিকুল ইসলামকে (৪৫) নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যাকারী আব্দুল আলিম পলাশ (৩৪) ছিলেন একজন মাদকাসক্ত। বাবার রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে নেশার টাকা জোগাড় করতেন তিনি। তাঁর অত্যাচারে টিকতে না পেরে স্ত্রীও তাঁকে ছেড়ে চলে যান। এদিকে রফিকুলের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে চলছে শোকের মাতম; অকালে পিতাহারা হয়েছে তিন সন্তান।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) আসর নামাজ শেষে জানাজা শেষে রফিকুল ও পলাশের মরদেহ নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। গণপিটুনিতে পলাশ নিহতের ঘটনায় তাঁর বোন পাপিয়া খাতুন অজ্ঞাতনামা কয়েকশ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
কে এই পলাশ? জগহাটি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, মৃত হযরত মন্ডলের ছেলে পলাশের সলুয়া বাজারে একটি ব্যাগের দোকান ছিল। নামমাত্র দোকানটি প্রায়ই বন্ধ থাকত। নেশার পিছনে লাখ লাখ টাকা নষ্ট করা পলাশের অত্যাচারে পরিবারের সদস্যরা ছিলেন অতিষ্ঠ। কয়েক মাস আগে পলাশ তাঁর স্ত্রী জোবাইদা খাতুনকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন, যাতে জোবাইদার হাতের পাঁচটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি বাবার বাড়ি চলে যান। টাকার জন্য পলাশ তাঁর বৃদ্ধা মাকেও মারধর করতেন। চার বছর আগে তাঁর বাবা হযরত মন্ডল দুশ্চিন্তায় স্ট্রোক করে মারা যান বলে জানান স্থানীয়রা। এর আগে পলাশ তাঁর চাচাতো ভাই করিম মোল্লাকেও কুপিয়ে জখম করেছিলেন।
পলাশের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধা মা পরিছন বেগম। পাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদছেন বোন পাপিয়া।
রফিকুলের বাড়িতে মাতম: স্থানীয়দের ভাষায়, রফিকুল ইসলাম একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন। সলুয়া বাজারে মুদি ব্যবসা করতেন তিনি। কোনো অপরাধ না করেও মাদকাসক্ত পলাশের হাতে প্রাণ দিতে হলো তাঁকে। দাম্পত্য জীবনে তিনি সুমাইয়া (২০), সুরাইয়া (১০) ও আবু হানিফা (৭) নামের তিন সন্তানের জনক ছিলেন। রফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সন্তানদের আর্তনাদে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
রফিকুলের মা মনোয়ারা বেগম আহাজারি করে বলেন, “পলাশ হেরোইন খেয়ে আমার সোনার জীবনটা কেড়ে নিল।” স্ত্রী লিপি খাতুন বলেন, “আমার স্বামী ন্যায্য টাকা দিয়ে ৮ শতক জমি কিনেছিলেন। কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে খুন করা হলো। আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।”
রফিকুলের চাচাতো ভাই শফিয়ার রহমান দাবি করেন, একই গ্রামের মিষ্টি ব্যবসায়ী আশাদুল ইসলাম ভুল বুঝিয়ে পলাশকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছিলেন। তিনি এই ঘটনার পেছনে উসকানিদাতা হিসেবে আশাদুলের বিচার দাবি করেন।
পুলিশের বক্তব্য: চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রেজাউল করিম জানান, রফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁর চাচাতো ভাই শফিয়ার রহমান বাদী হয়ে মামলা করেছেন। অন্যদিকে, গণপিটুনিতে পলাশ নিহতের ঘটনায় তাঁর বোন পাপিয়া অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলাগুলো তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: উল্লেখ্য, দুই বছর আগে পলাশের কাছ থেকে ৮ শতক জমি ক্রয় করেন রফিকুল ইসলাম। সম্প্রতি পলাশ সেই একই জমি অন্য এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিলে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই জের ধরে গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারে রফিকুলকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেন পলাশ। পরে উত্তেজিত জনতা পলাশকে গণপিটুনি দিলে তিনিও নিহত হন।
এনআই