হাওর মানেই শুকনো মৌসুমে ধান চাষের সমারোহ। যতদূর চোখ যায় সবুজ ধানের ক্ষেত। অথচ দিনে দিনে সেই চির চেনা দৃশ্যে ছেদ পড়ছে। হাওর পাড়ের কৃষকরা আর আগের মতো ধান চাষে আগ্রহী নয়। তারা ঝুঁকছেন অন্যান্য উৎপাদনমুখী ফসল চাষে। চলতি বছর হাওর অঞ্চলে বেড়েছে ভুট্টার আবাদ। কৃষকরা এখন ভুট্টা চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
গত বছর লাভের মুখ দেখায় এ বছর তারা ব্যাপকভাবে ভুট্টা চাষ করেছেন। ধান চাষে প্রতিবছরই আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হন হাওরের কৃষকরা। তখন মহাজনের দেনা পরিশোধে কৃষক হয়ে পড়েন দিশেহারা। এ অবস্থায় কম খরচে বেশি লাভজনক হওয়ায় কিশোরগঞ্জের হাওরে ব্যাপকভাবে ভুট্টা চাষ করেছেন কৃষকরা। ফলে পাল্টে যাচ্ছে কৃষকের জীবন-জীবিকা ও চাষাবাদের ধরন।
কৃষকরা জানায়, বোরো ধানের আবাদ করে কোনোরকমে উৎপাদন খরচ উঠলেও গত কয়েক বছর তাদের উল্লেখযোগ্য লাভ হচ্ছে না। বোরো আবাদের সময় ধানের বীজ, বীজতলা তৈরি, সার, কৃষি শ্রমিক, কীটনাশক, জমিতে পানি দেওয়া, ধান কাটা ও ধান মাড়াই মিলে প্রতি একরে (১০০ শতাংশ) খরচ হয় ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। একরপ্রতি ধানের ফলন হয় ৬৫ থেকে ৭৫ মণ। ওই ৭৫ মণ বোরো ধান বাজারদরে বিক্রি করে পাওয়া যায় ৪০-৪৫ হাজার টাকা। এতে লাভের পরিমাণ খুবই কম। আর দুর্যোগ হলে তো কথাই নেই। ফলে ভুট্টা চাষে খরচ অনেক কম, কম পরিশ্রম আর ধানের চেয়ে কম সময়ে ফসল গোলায় যায় এবং এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি ফসল। প্রতি বিঘা জমি থেকে চলতি মৌসুমে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ মণ ভুট্টা ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও ভুট্টা চাষ করলে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। যার কারণে প্রতি বছরই ভুট্টা চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জানা গেছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খাদ্যশস্যের অফুরন্ত ভান্ডার বলে খ্যাত হাওর জেলা কিশোরগঞ্জ। একসময় এ জেলার কৃষকরা শুধুমাত্র বোরো আবাদের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সেখানে দিন দিন বেড়ে চলছে ভুট্টা চাষ। হাওরের পতিত জমি ও বোরো আবাদের অনেক জমিতেও বর্তমানে ভুট্টা চাষ করছেন কৃষকরা। বিশেষ করে গত কয়েক বছর আগে হাওরের ভুট্টা আবাদ শুরু হয়। সে সময় কৃষকরা ভুট্টা চাষ করে অনেক লাভবানও হয়। এ থেকেই হাওরের পতিত জমি ও বোরো আবাদের অনেক জমিতে ভুট্টা চাষ করছেন কৃষকরা। ভুট্টা চাষে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয়ী। এছাড়া হাওর অলওয়েদার সড়ক নির্মাণের ফলে বাজারজাতকরণ সুবিধা পাচ্ছে কৃষকরা। এদিকে ভুট্টা গাছের পাতা গো-খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। একইসঙ্গে ফসল সংগ্রহ শেষে ভুট্টার গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হাওরাঞ্চলে জ্বালানির সমস্যা সমাধানে ভুট্টা অন্যতম সহায়ক বলেও মনে করেন গৃহিণীরা। এর বছর কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলাগুলোতে মাঠের পর মাঠ চাষ করা হয়েছে ভুট্টার। ভবিষ্যতে এ আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে বিভিন্ন হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, যেসব জমিতে গতবছরও ধানের আবাদ হয়েছে সেসব স্থানে মাঠের পর মাঠ দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। কৃষকের ক্ষেতে শোভা পাচ্ছে বেড়ে ওঠা ভুট্টার চারা। দেখেই মনে হয় সবুজ রঙের গাছগুলো বাতাসের দোলায় কৃষকের সফলতার স্বপ্নগুলো হেসে বেড়াচ্ছে। কোথাও তরতাজা হয়ে গাছ বেরিয়ে আসছে। আবার কোথাও দেরিতে রোপন করায় চলছে সেচ ও পরিচর্চার কাজ। উৎপাদন খরচ ও পরিশ্রম কম, ফলন বেশি এবং দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে ভুট্টা চাষে। আশানুরূপ ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন নিয়ে ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও কাজ করতে দেখা যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণের তথ্য মতে, গত বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় ১২ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছিল। এতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল যেখানে উৎপাদন ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। চলতি বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রায় ১১ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, যদি ফলন ঠিক থাকে তাহলে এ বছর এ জেলায় ১ লক্ষ ২০ হাজার ৫০০ টন ভুট্টা উৎপাদন হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরও কৃষকরা ভুট্টা চাষে সফলতা পাবে। দিনের পর দিন চাষিদের উৎসাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামীতে এর লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়বে এবং ভুট্টা চাষেই দরিদ্র কৃষকেরা আর্থিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অফিস।
একাধিক কৃষকরা জানান, আগে জমিতে বোরো ধান আবাদ করলেও তাতে খরচ অনেক বেশি পড়ে যেত। আবার প্রতিবছরই আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধান নষ্ট হয়ে যেতো। এ জন্য বোরো ধান আবাদ বাদ দিয়ে ভুট্টার আবাদ করেন তারা। এদিকে ভুট্টাখেতের কোনো ধরনের রোগবালাই-পোকামাকড় আক্রমণ করে কম। আল্লাহর ইচ্ছায় এবার কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ভালোভাবে ফসল তুলতে পারবেন এবং বাজারে ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছেন কৃষকরা।
ইটনা উপজেলার রায়টুটি ইউনিয়নের শোয়াইর গ্রামের ভুট্টা চাষি আবদুল কদ্দুস বলেন, কৃষক হিসেবে সবসময় ধান চাষেই আগ্রহ আমার। তাছাড়া হাওরে ধানের ফলনও ভাল হয়। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে অকাল বন্যা, বৃষ্টিতে আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মহাজনী ঋণ নিয়েও অনেক বিপাকে পড়েছি। তাই ভুট্টা চাষ গত দু'বছর থেকে শুরু করেছি। বিশেষ করে ভুট্টা চাষে বেশি লাভ পাচ্ছি। আর সময়মতও ভুট্টা চাষ করে ঘরে তুলতে পারছি। ভুট্টা আবাদে খরচও কম হয়।’ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলে ধান চাষে ঝুঁকি থাকলেও ভুট্টা চাষে তেমন কোনও ঝুঁকি নেই। কারণ বর্ষার আগেই ভুট্টা ঘরে তুলা যায়। মোটামুটি দামে বিক্রি করতে পারলেও ভুট্টা চাষে কমবেশি লাভ থাকে।
নিকলী উপজেলার দরগাহাটি এলাকায় ও ভুট্টা চাষি আবদুল সাত্তার বলেন, এ বছর আমি ৮ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। গত বছর ৩ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করে ভালো টাকা পেয়েছি। তাই এবছরও ৮বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। ওই ৩ বিঘা জমিতে ১০৫ মণ ভুট্টা হয়েছে। প্রতিমণ ভুট্টা সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছি। ফলে এ বছর ৮ বিঘা জমিতে ভুট্টা বপন করেছি।
মিঠামইন উপজেলার কেওয়ারজোড় ইউনিয়নের তেলিখাই গ্রামের ভুট্টা চাষি বাদল মিয়া বলেন, আমিই প্রথম এখানে ভুট্টা চাষ শুরু করি। পরে লাভের মুখ দেখায় প্রতি বছর আবাদ বাড়াচ্ছি। বর্তমানে আমাকে দেখে অনেক কৃষক ভুট্টা চাষ শুরু করেছেন। ভুট্টা লাভজনক একটি ফসল। তা ছাড়া, জমি পড়ে থাকার চেয়ে ভুট্টা চাষ করে অনেক কৃষক তাদের পরিবার নিয়ে এখন ভালো আছেন। ভুট্টা সাধারণত চার মাসের ফসল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ভুট্টার বীজ বপন করতে হয়। মার্চ-এপ্রিলের ফসল ঘরে চলে আসে। এখন ভুট্টা গাছে মোচা ধরতে শুরু করেছে।
কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজে সহকারী অধ্যাপক সাদেকুর রহমান বলেন, কৃষকরা আগে ধান আবাদ করত, এখন কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত নিকলী, মিঠামইন, বাজিতপুর ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এখন আগের চেয়ে ভুট্টার আবাদ বেশি হচ্ছে। চাহিদা থাকায় ভুট্টার দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষকেরা। ফলে ভুট্টার আবাদের ঝুঁকছে কৃষকরা। এর কারণ হলো, ভুট্টার আবাদে তারা সাশ্রয় পাচ্ছেন। ধান আবাদ করলে চরের মধ্যে পানির বেশি প্রয়োজন খরচ বেশি হতো। কিন্তু ভুট্টায় সে খরচটা হচ্ছে না। এতে কৃষকরা লাভবান বেশি হচ্ছে।
উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা জানান, তারা বরাবরই কৃষকদের ভুট্টা চাষে প্রণোদনা দিয়ে আসছেন। ভুট্টা চাষে লাভ বেশি, খরচ কম। তা ছাড়া, জমি পড়ে থাকার চেয়ে কৃষকদের চাষে আগ্রহী করছেন। এতে কৃষকরাও অনেক বেশি লাভের মুখ দেখছেন। ভুট্টার ফলন ঘরে উঠাতেও কৃষি কর্মকর্তারা বিভিন্ন কাটার মেশিন তাদের বিনামূল্যে হস্তান্তর করেছেন। তারা আশা করছেন এবছরও অধিক ফলনের মুখ দেখবেন এখানকার ভুট্টা চাষিরা।
দিন দিন জেলায় ভুট্টার আবাদ বাড়ছে জানিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোঃ সাদিকুর রহমান বলেন, পুষ্টিসমৃদ্ধ ভুট্টা লাভজনক হওয়ায় চাষাবাদে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। ভুট্টা আবাদে হাওরে কোনো ঝুঁকি নেই, উৎপাদন খরচ কম আবার দামও ভালো পাওয়া যায়। পাশাপাশি বোরো উৎপাদনের এক মাস আগে ভুট্টা মাড়াই ও গুদামজাত করা যায়। তাই দিন দিন ভুট্টার প্রতি ঝুঁকছে কৃষকরা। কৃষি বিভাগ তাদের নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। মাঠকর্মীরা সার্বক্ষণিক তাদের পাশে রয়েছে। এতে কৃষকেরা ভুট্টা আবাদে অনেক বেশি উৎসাহী। ভুট্টা এখন গরু, মহিষ, ছাগল, মাছ, হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষকরা।
এসআর