মানুষের কষ্টের খবর পেলেই নিঃশব্দে ছুটে যান তিনি। কারও হাতে তুলে দেন প্রয়োজনীয় ওষুধ, কারও পাশে দাঁড়ান আপনজনের মতো। তিনি জনস্বাস্থ্য ও ক্যান্সার গবেষক ড. সৈয়দ হুমায়ুন কবির। অসংখ্য মানুষের কাছে তাঁর পরিচয়, নিভৃত মানবতার ফেরিওয়ালা।
দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষদের নিয়ে কাজ করছেন জনস্বাস্থ্য ও ক্যান্সার গবেষক ড. হুমায়ুন কবির। ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার সোসাইটি বাংলাদেশ। এই সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। সেখানে অসহায় রোগীরা বিনামূল্যে পান চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ওষুধ। গ্রাম থেকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য আসা ক্যান্সার রোগীদের জন্য রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স সেবা, থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয়ের সহায়তাও দেওয়া হয়।
ড. হুমায়ুন কবির মনে করেন, চিকিৎসা কেবল ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন। সে কারণেই অনেক সময় তিনি রোগীর পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেন। কেউ সেলাই জানলে হাতে তুলে দেন সেলাই মেশিন, কেউ রিকশা চালাতে চাইলে কিনে দেন রিকশাভ্যান, আবার কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করতে চাইলে জোগাড় করে দেন পুঁজি। তাঁর ভাষায়, একজন রোগীর জীবন থেমে গেলেও তার পরিবার যেন জীবন থেকে ছিটকে না পড়ে।
ময়মনসিংহের শরীফুল ইসলাম। তাঁর মা স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা নামক জটিল ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয়ের ভার বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে দিশেহারা হয়ে পড়া এই পরিবারের পাশে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন জনস্বাস্থ্য ও ক্যান্সার গবেষক ড. সৈয়দ হুমায়ুন কবির।
শরীফুল ইসলাম জানান, তাঁর মায়ের কেমোথেরাপির খরচ থেকে শুরু করে গ্রাম থেকে শহরে যাতায়াতসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রায় সব ব্যয়ই বহন করেছেন ড. হুমায়ুন কবির। শুধু চিকিৎসাকালীন সহায়তাই নয়, এখনো তিনি নিয়মিতভাবে শরীফুলের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
এ ধরনের মানবিক উদ্যোগের আরেকটি উদাহরণ তুলে ধরেন ইমরান নামের এক যুবক। তিনি বলেন, হুমায়ুন স্যার একজন অনন্য মানুষ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আমার কিডনিতে পাথর ধরা পড়ে। জরুরি অপারেশন ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু অর্থাভাবে অপারেশন করাতে পারছিলাম না। তখন হুমায়ুন স্যার নিজ উদ্যোগে আমার অপারেশনের ব্যবস্থা করেন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা দেন। অপারেশনের পরও তিনি নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন।
দুর্যোগের সময় তাঁর মানবিক ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনি ছুটে যান খাবার ও ওষুধ নিয়ে। করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়ে, যখন শহর কার্যত অচল, মানুষ ঘরবন্দি, তখনও তিনি থেমে থাকেননি। সেই সময় তাঁর উদ্যোগে অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় খাবার, ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার, নেবুলাইজার ও সুরক্ষা সামগ্রী। তাঁর এই উদ্যোগে সহায়তা পেয়েছেন হাজারো মানুষ।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়েও রয়েছে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা। সুস্থ মানুষ গড়তে হলে সুস্থ পরিবেশ জরুরি, এই বিশ্বাস থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাঁর উদ্যোগে রোপণ করা হয়েছে লক্ষাধিক গাছ। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিয়ে স্কুল, কলেজ ও গ্রামপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বর্তমানে সংগঠনের মাধ্যমে বিনামূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার সেবা, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ও ফ্রি মেডিকেল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নতুন উদ্যোগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ফ্রি ব্লাড টেস্ট সেবা, যেখানে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের প্রয়োজনীয় রক্তপরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হবে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- এই বিশাল মানবিক কর্মকাণ্ডের পেছনে নেই কোনো বড় দাতা সংস্থা বা করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা। নেই আত্মপ্রচারের তাগিদ। মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই নীরবে সব কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
ড. সৈয়দ হুমায়ুন কবির আলোঝলমলে মঞ্চে না উঠলেও, মানুষের জীবনে তাঁর উপস্থিতি গভীর ও স্থায়ী। যাদের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন, তাদের কাছে তিনি আশার নাম, নিঃশব্দ মানবতার এক নির্ভরতার প্রতীক।