দুই সপ্তাহ ধরে চলা ক্রমবর্ধমান সহিংস বিক্ষোভের মাঝেই ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দেশের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তার সরকার জনগণের কথা শোনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান আপসের সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, চাপের মুখে থাকা ইরানের প্রশাসন দেশের অর্থনৈতিক সব সমস্যা সমাধানের বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে প্রাণঘাতী অস্থিরতিশীলতা উসকে দেওয়ার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো সমস্যার সমাধান করা, মানুষের উদ্বেগের জবাব দেওয়া এবং তিনি যাদের দাঙ্গাকারী বলেছেন, তাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে না দেওয়া। তিনি বলেন, সুতরাং আমরা পরিবারগুলোর কাছে অনুরোধ করছি—তাদের সন্তানদের যেন সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজদের সৃষ্ট অস্থিরতায় জড়িয়ে পড়তে না দেন।
ইরানের এই প্রেসিডেন্ট বলেন, শত্রুপক্ষ প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীদের দেশে ঢুকিয়েছে... দাঙ্গাবাজরা প্রতিবাদী মানুষ নন। আমরা প্রতিবাদীদের কথা শুনছি এবং তাদের সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, আমাদের যা কিছু আছে, তা জনগণের মাঝে ন্যায্যভাবে বণ্টন করাই সরকারের লক্ষ্য। তারা যে দল, গোষ্ঠী, জাতিগোষ্ঠী, বর্ণ, এমনকি যে প্রদেশ, উপভাষা বা ভাষারই হোক না কেন।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রার ভয়াবহ পতনের পর দেশটিতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা হয়। বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে মুদ্রার অবমূল্যায়ন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ক্ষোভ থেকে সৃষ্ট বিক্ষোভ-প্রতিবাদ দেশটিতে ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চলমান বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নির্দেশনা দিয়ে দেশে ‘‘অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা’’ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। দেশের মানুষকে দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীদের থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা ইরানের এই বিক্ষোভ ২০২২-২০২৩ সালের আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারীদের জন্য কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনি পুলিশ হেফাজতে মারা যাওয়ার পর দেশটিতে ওই আন্দোলন শুরু হয়েছিল।
পেজেশকিয়ান বলেন, মানুষের উদ্বেগ আছে। আমাদের তাদের সঙ্গে বসতে হবে এবং যদি সেটাই আমাদের দায়িত্ব হয়, তাহলে তাদের উদ্বেগের সমাধান করতে হবে। কিন্তু আরও বড় দায়িত্ব হলো—কোনো দাঙ্গাকারী গোষ্ঠীকে পুরো সমাজ ধ্বংস করতে না দেওয়া।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিবাদীদের সঙ্গে বিদেশে প্রশিক্ষিত দাঙ্গাকারীদের মধ্যে পার্থক্য টানার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ইরানের জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা জনরোষকে ন্যায্য বলে স্বীকার করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি দ্রুত বাড়তে থাকা দাম, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং স্থানীয় মুদ্রার ভয়াবহ অবমূল্যায়নের কথা উল্লেখ করেছেন। এসবই এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পকেটে বিপুল চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলেছে, বিক্ষোভ চলাকালে দেশজুড়ে ১০৯ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। রোববার আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ শান্তিপূর্ণ ও সশস্ত্র বিক্ষোভকারীদের মধ্যে পার্থক্যের কথা জোর দিয়ে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান অর্থনৈতিক উদ্বেগ নিয়ে মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ স্বীকার করে। তবে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে সরকার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার পর ওয়াশিংটনকে কড়া সতর্কবার্তাও দিয়েছেন দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সাবেক কমান্ডার ঘালিবাফ।
তিনি বলেন, ইরানে হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ডের (ইসরায়েল) পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে। এ সময় কিছু আইনপ্রণেতাকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিতে শোনা যায়।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘‘সহায়তা দিতে প্রস্তুত’’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত দিলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি নাকচ করেছেন তিনি।
ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশে অস্থিরতা কমে আসছে বলে রোববার দাবি করেছে। অন্যদিকে, দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়তে পারেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা বলেছে, ইরানজুড়ে ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা, এএফপি।
এবি