জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের মূল ফটকে দাঁড়ালে বোঝার উপায় নেই ভেতরের বাস্তবতা। বাইরে ঝুলছে ৫০ শয্যার হাসপাতালের সাইনবোর্ড, তবে ভেতরে ঢুকলেই ধরা পড়ে সংকটের চিত্র। রোগীর ভিড় আছে, আছে ভবন ও শয্যা; তবে যা নেই তা হলো প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল। একমাত্র আবাসিক মেডিকেল অফিসারের ওপর নির্ভর করেই কোনোরকমে চলছে চিকিৎসাসেবা। দীর্ঘ এক দশক পেরিয়ে গেলেও ৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে কার্যক্রম শুরু হয়নি এই স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে।
জানা যায়, ভারতীয় সীমান্তবর্তী বকশীগঞ্জ উপজেলার তিনলাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসাস্থল বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪-৫শ’ রোগী এই হাসাপতালে চিকিৎসা সেবার জন্য আসেন। বকশীগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও প্রতিবেশী শ্রীবরদী উপজেলা, রাজিবপুর-রৌমারী ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলের ৬-৭ টি ইউনিয়নের মানুষ বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন।
দরিদ্র ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর ৩১ শয্যার হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুই বছর পর, ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই হাসপাতালটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করা হয়। তবে উদ্বোধনের পর কেটে গেছে ১১ বছর, বাস্তবে বাড়েনি কোনো শয্যা কার্যক্রম। আসেনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি। এমনকি ৩১ শয্যার জন্য যে জনবল থাকার কথা, সেটিও আজও পূরণ হয়নি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৫০ শয্যার জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ মোট ২৪টি চিকিৎসক পদের প্রায় সবকটিই শূন্য। কার্ডিওলজি, সার্জারি, শিশু, চর্ম ও যৌন, নাক–কান–গলা, চক্ষু, অর্থোপেডিক কিংবা অ্যানেসথেসিয়া—কোনো বিভাগেই নেই বিশেষজ্ঞ। পাশাপাশি ইনডোর মেডিকেল অফিসার, প্যাথলজিস্ট, নার্সিং সুপারভাইজার, মিডওয়াইফ, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, হিসাবরক্ষকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা পড়ে আছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মর্কতা ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছাড়া কোন চিকিৎসক নেই। উপজেলার ৭ ইউনিয়নের সাব সেন্টারে সাতজন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও একজনও নেই। এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি রোগীদের ওপর। ছোটখাটো অস্ত্রোপচার কিংবা জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য অধিকাংশ রোগীকেই পাঠানো হচ্ছে জামালপুর সদর হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা ঢাকায়।
এদিকে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দুইটি অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছে একটি। সেটিও মাঝে মধ্যেই বিকল হয়ে পড়ে থাকে। ফলে জরুরী প্রয়োজনে রোগীদের প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে অতিরিক্ত কয়েকগুন বাড়তি ভাড়া দিয়ে যেতে হয় গন্ত্যব্যের হাসপাতালে।
হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও তা আজ পর্যন্ত ব্যবহার হয়নি। ইসিজি মেশিন রয়েছে, কিন্তু জরুরি সময়ে সেটি প্রায়ই বিকল থাকে।
৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দুইটি অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছে একটি। সেটিও মাঝে মধ্যেই বিকল হয়ে পড়ে থাকে। ফলে জরুরী প্রয়োজনে রোগীদের প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে অতিরিক্ত কয়েকগুন বাড়তি ভাড়া দিয়ে যেতে হয় গন্ত্যব্যের হাসপাতালে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা ফারাজীপাড়া গ্রামের রোকসানা বেগম, আলাল উদ্দিন, চন্দ্রাবাজ এলাকার রিমা বেগম সহ বেশ কয়েকজন রোগী জানান, এই হাসপাতালে ডাক্তার পাওয়া যায়না। জরুরী বিভাগে যে ওষুধ দেন তার বেশিরভাগই বাইরে থেকে কিনতে হয়।
বগারচর ইউনিয়নের সারমারা থেকে আসা মধ্যবয়সী নারী রোকেয়া বেগম বলেন, তার মেয়ের পেটের ব্যাথার জন্য হাসপাতালে এসেছেন। দীর্ঘক্ষন বসে থেকে ডাক্তার না পেয়ে নিরুপায় হয়ে বাইরের ক্লিনিকে ডাক্তার দেখান তিনি। ডাক্তার না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘তিনি এবং একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছাড়া হাসপাতালে কোন ডাক্তার নেই। এ ছাড়াও ৭ ইউনিয়নের সাব সেন্টারে সাতজন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে একজনও নেই। যার বোঝা প্রতিদিন বইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।’
আরডি