এইমাত্র
  • ফেসবুকে ভোট চাওয়ায় জামালপুর-২ আসনের বিএনপি প্রার্থীকে শোকজ
  • হবিগঞ্জে প্রকাশ্য ‘ইয়াবার’ বিজ্ঞাপন, জনমনে উদ্বেগ
  • ঢাকায় পৌঁছেছেন নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত
  • ফুটবল মাঠে অদ্ভুত কাণ্ড, দর্শককে ‘লাল কার্ড’ দেখালেন রেফারি!
  • ফুলবাড়ী সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠক
  • বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের খবর জানে না বিসিসিআই
  • শেরপুরে ১ সপ্তাহে ৮ টি গরু চুরি
  • হ্যাট্রিক হার দিয়ে সিলেট পর্ব শেষ করল রংপুর
  • জাজিরার বিলাসপুরে ৪৫ ককটেল উদ্ধার, আটক ৪
  • ঠাকুরগাঁওয়ে বেদখল হওয়া জমি ৫০ বছর পর ফেরত পেলেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান
  • আজ সোমবার, ২৯ পৌষ, ১৪৩২ | ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
    দেশজুড়ে

    ১৭ বছরে পরিকল্পিত নগরায়ণে ব্যর্থ সিডিএ, বাধা মৌজা দর ও হুকুমদখল নীতি

    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম
    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

    ১৭ বছরে পরিকল্পিত নগরায়ণে ব্যর্থ সিডিএ, বাধা মৌজা দর ও হুকুমদখল নীতি

    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

    দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রাম। বন্দরনগরী হিসেবে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। অথচ এই নগরীতেই গত ১৭ বছরে পরিকল্পিত আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্প এলাকা গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। 

    এই দীর্ঘ সময়ে নগরীতে দুই হাজার একরেরও বেশি জমিতে পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ থাকলেও একটি প্লটও তৈরি বা বরাদ্দ দিতে পারেনি সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগর পরিকল্পনা আইন ও চট্টগ্রাম মহানগরীর মাস্টার প্ল্যানে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।

    নগর উন্নয়ন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যর্থতা শুধু সিডিএর প্রশাসনিক অকার্যকারিতাই নয়, বরং এটি চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নগরজীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে।

    সিডিএ আইন অনুযায়ী প্রতি বছর নগরীতে অন্তত ৫০ হেক্টর জমিতে পরিকল্পিতভাবে আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্প এলাকা গড়ে তোলার কথা। একই বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরীর মাস্টার প্ল্যানেও। পরিকল্পিত নগরায়ণের মূল উদ্দেশ্য হলো ভূমির অপব্যবহার রোধ, প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ তৈরি করা।

    কিন্তু বাস্তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় নগরীতে বস্তির বিস্তার ঘটছে, অপরিকল্পিত ভবন গড়ে উঠছে, সরু সড়কে যানজট বাড়ছে। অনেক এলাকায় ফায়ার সার্ভিস কিংবা অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার সুযোগ নেই। এতে মানুষের জীবন, ধনসম্পদ এবং সামগ্রিক নগর নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

    সিডিএর একটি সূত্র জানায়, গত ১৭ বছরে যদি দুই হাজার একর জমিতে পরিকল্পিত উন্নয়ন করা যেত, তাহলে সেখানে অন্তত ১২ হাজার প্লট তৈরি করা সম্ভব ছিল। এসব প্লট সাধারণ মানুষের কাছে বরাদ্দ দেওয়া গেলে একদিকে নগরবাসীর আবাসন সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হতো, অন্যদিকে সিডিএর তহবিল শক্তিশালী হয়ে নগর উন্নয়নের নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হতো।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিবারই প্রকল্প থমকে গেছে ভূমির মৌজা দর ও হুকুমদখল সংক্রান্ত নীতির কারণে।

    ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সিডিএ তার যাত্রার শুরু থেকে দীর্ঘ কয়েক দশকে নগরীতে ১২টি আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এসব আবাসিক এলাকায় মোট ৬ হাজার ৩৬৪টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনন্যা আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে সংস্থাটি। সেই প্রকল্পের পর গত ১৭ বছরে আর কোনো নতুন আবাসিক এলাকা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সিডিএ।

    অনন্যা আবাসিক এলাকার দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবতা ও হিসাব-নিকাশের কঠিন দেয়ালে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পটি।

    সিডিএ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মৌজা ভ্যালু অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে কোনো মিল রাখে না। নগরীর আশপাশের বহু এলাকায় যেখানে জমির বাজারদর কাঠাপ্রতি দুই লাখ টাকাও নয়, সেখানে মৌজা দর নির্ধারণ করা হয়েছে সাত থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর ওপর হুকুমদখলের ক্ষেত্রে ওই মৌজা দরের তিন গুণ টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় জমি অধিগ্রহণের ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

    একজন কর্মকর্তা জানান, হাটহাজারীর অনুন্নত এলাকায়, যেখানে রাস্তাঘাট নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল, নাগরিক সুবিধা নেই, সেখানে প্রতি কাঠা জমি হুকুমদখল করতে গেলে বিশ লাখ টাকারও বেশি গুনতে হচ্ছে। এরপর ভূমি উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান তৈরি করতে কাঠাপ্রতি আরও আট থেকে দশ লাখ টাকা খরচ হয়।

    সব মিলিয়ে একটি প্লট তৈরি করতে কাঠাপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। এ অবস্থায় প্রতি কাঠা ৪০ লাখ টাকার নিচে প্লট বিক্রি করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

    সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহর থেকে বহু দূরের এলাকায় প্রতি কাঠা ৪০ লাখ টাকায় প্লট কিনতে সাধারণ মানুষ আগ্রহ দেখাবে না। এতে সিডিএ বিনিয়োগ করেও ক্রেতা না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বাস্তবতা বিবেচনায় ২০১৬ সালেই ‘অনন্যা আবাসিক (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প’ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

    একনেকে অনুমোদিত ২ হাজার ৮৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকার এই প্রকল্পটি প্রথমে পাঁচলাইশ, কুয়াইশ ও বাথুয়া মৌজার ৪১৮ দশমিক ৭৩ একর জমিতে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। পরে মৌজা দরের কারণে পাঁচলাইশ ও কুয়াইশ মৌজা বাদ দিয়ে হাটহাজারীর বাথুয়া ও শিকারপুর মৌজার ২৭৬ একর জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও প্লটের সম্ভাব্য মূল্য ৩৫–৪০ লাখ টাকার নিচে নামানো সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।

    সিডিএর এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান নিয়মে ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন করে আবাসিক এলাকা গড়ে তুললে তিন কাঠার একটি প্লটের দাম কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এতে মধ্যবিত্তের জন্য প্লট কেনা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। ক্রেতা না থাকলে সিডিএর তহবিল আরও সংকটে পড়বে।

    বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রচলিত নিয়মে চট্টগ্রামে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ভূমির মৌজা দর পুনর্বিবেচনা, হুকুমদখল নীতিতে সংস্কার এবং বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া যাবে না।

    পরিকল্পনাবিদদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব আসছে বলে জানিয়েছেন সিডিএ কর্মকর্তারা। সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সিডিএর আয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

    এই প্রসঙ্গে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নুরুল করিম সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘আমরা লুপ রোড আবাসিক এলাকা এবং অনন্যা দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রধান সমস্যা হচ্ছে অর্থ। জমির দাম খুব বেশি, আবার সিডিএর ফান্ডেও পর্যাপ্ত টাকা নেই। একটি জায়গা হুকুমদখল করে আবাসিক এলাকা করতে হলে শুরুতেই বিপুল বিনিয়োগ করতে হয়। পরে প্লট বরাদ্দ দিয়ে টাকা ওঠে। কিন্তু শুরুতে এত বড় বিনিয়োগ দেওয়ার সক্ষমতা এখন সিডিএর নেই। তবুও বিকল্প উপায়ে কিছু করার চেষ্টা করছি।’

    দীর্ঘ ১৭ বছরে পরিকল্পিত একটি প্লটও তৈরি না হওয়া চট্টগ্রামের নগর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকেত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর সিদ্ধান্ত না নিলে অপরিকল্পিত নগর বিস্তার আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। নাগরিক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জীবনমান, সবকিছুই পড়বে চরম ঝুঁকিতে।

    আরডি

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    সর্বশেষ প্রকাশিত

    Loading…