চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিসে সরকারি সেবা এখন সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির আরেক নাম। নামজারি, খারিজ কিংবা খাজনা, প্রতিটি কাজেই নির্ধারিত ফি ছাড়িয়ে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। অভিযোগ উঠেছে, এই অনিয়ম ও দালালনির্ভর ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভূমি অফিসের অফিস সহকারী সঞ্জয়। স্থানীয়দের ভাষায়, কাগজে-কলমে এসি-ল্যান্ড থাকলেও বাস্তবে পুরো ভূমি অফিস চলে তাঁর ইশারায়।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেখানে নামজারি ও খারিজের ফি ১ হাজার ১৫০ টাকা, সেখানে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না। দিনের পর দিন ঘুরেও কাজ হয় না।
অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিসে গেলে সময়ের কন্ঠস্বরের প্রতিবেদকের চোখে পড়ে দালালদের অবাধ বিচরণ। অফিস চত্বরে সন্দেহজনক গতিবিধির এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তিনি নিজেকে ভূমি অফিসের পরিচিত দালাল বলে স্বীকার করেন। জানান, তিনি গত ৬-৭ বছর ধরে এ কাজে যুক্ত।
ওই দালালের দাবি, নামজারি ও খারিজের নামে জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এর বড় অংশ অফিসের ভেতরেই দিতে হয়। তাঁর ভাষায়, ‘টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না।’
ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার পরও কাজ ঝুলে থাকে। আবার চাপ সৃষ্টি করতে সেবাগ্রহীতাদের নথিপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে গায়েব করে রাখা হয়। জাল দলিলের মাধ্যমে জমির নামজারি হয়ে যাচ্ছে অন্যের নামে, এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে প্রকৃত মালিকরা বছরের পর বছর ভূমি অফিসের বারান্দায় ঘুরেও ন্যায্য সেবা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে ভূমি অফিসের কানুনগো মঞ্জুর আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে ভিডিও ধারণ বন্ধ করার অনুরোধ করেন। ঠিক তখনই কয়েকজন দালাল দ্রুত সেখান থেকে সরে যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিস সহকারী সঞ্জয় দালালদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, গরিব-অসহায় থেকে শুরু করে বিত্তবান, কেউই তাঁর কাছ থেকে ছাড় পান না। টাকা না দিলে দিনের পর দিন ঘুরিয়েও কাজ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সঞ্জয় নিজেই ঠিক করে দেন, কোন দালালের মাধ্যমে কত টাকা দিতে হবে।
এলাকাবাসী ও একাধিক সূত্র জানায়, এর আগে পার্শ্ববর্তী পটিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সেখান থেকে বদলি হয়ে আনোয়ারায় এলেও তাঁর কর্মকাণ্ডে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ।
আনোয়ারা উপজেলা যুবদল নেতা ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমার চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে সঞ্জয় ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু কাজ করেনি। সংবাদ প্রকাশ হতে পারে, এমন ধারণা পেয়ে আজ আবার তাকে ডেকে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছে।’
এখানেই শেষ নয়, সংবাদ প্রকাশ না করতে অর্থের প্রস্তাবও করেন অফিস সহকারী সঞ্জয়। তিনি প্রতিবেদককে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য, এতে কাজ না হলে আরও টাকা দেওয়া হবে, তবে সংবাদ যেন প্রকাশ না হয়। এ সময় তাঁর পক্ষে কানুনগো মঞ্জুর আলমও অনুরোধ ও সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, ‘এভাবে ডিস্টার্ব করলে কেমনে কী! সঞ্জয় নতুন এসেছে, টাকা কামানোর সুযোগ দেন। ফেব্রুয়ারিতে আবার আসেন, তখন ৩০ হাজার টাকা দেব।’
জানা গেছে, কানুনগো মঞ্জুর আলম পূর্বে চট্টগ্রাম চট্টেশ্বরী রোড এলাকার ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল।
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দীপক ত্রিপুরা সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, অফিস সহকারী সঞ্জয় আনোয়ারায় এসেছেন বেশিদিন হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে তা আমাকে পাঠিয়ে রাখুন। যাচাই-বাছাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আনোয়ারা ভূমি অফিসে প্রকাশ্য দালালি, ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মে ভূমি প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। সরকারি সেবা নিতে এসে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরছেন।
এসআর