উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্বের শেষ ‘ম্যাচ ডে’ তে অবিশ্বাস্য কিছু কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা আর নাটকীয়তার; সব মিলিয়ে বুধবার (২৮ জানুয়ারি) এক পাগলাটে রাতের স্বাক্ষী হয়েছেন ফুটবল প্রেমিরা।
গ্রুপ পর্বের শেষদিন একই সময়ে মাঠে নেমেছিল ৩৬টি দল। এদিন প্রতিটি গোলের পরই বদলে যাচ্ছিল হিসাব-নিকাশ। এক মুহূর্তে কোনো দল স্বপ্ন বুঁনছিল তো পরক্ষণেই তা ভেঙে পড়ছিল। শেষ মুহূর্তে ইউরোপ কাপানো কোনো দল হতাশা নিয়ে মাঠ ছেড়েছে তো আবার কোনো ছোট ক্লাব লিখে ফেলল অবিশ্বাস্য ইতিহাস।
লিসবনে লস বাঙ্কোসদের ‘লস’, প্লে অফে বেনফিকা
সরাসরি শেষ আট নিশ্চিতের লক্ষ্যে পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার আতিথ্য নিয়েছিল স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। এ ম্যাচে পরিষ্কার ফেভারিট থাকলেও শেষ পর্যন্ত হতাশার হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে লস বাঙ্কোসদের।
এদিন সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে রিয়াল মাদ্রিদ ও বেনফিকার ম্যাচটি। যখন অন্য ১৭টি ম্যাচ শেষ, তখনও খেলা চলছিল লিসবনে। ম্যাচ শুরুর আগে পয়েন্ট টেবিলে তিনে থাকা রিয়াল শেষ পর্যন্ত নেমে যায় নবম স্থানে। বিপরীতে বেনফিকা শেষ মুহূর্তের জয়ে নিশ্চিত করে প্লে-অফ।
ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা সময়ে বেনফিকা ৩-২ এগিয়ে থাকলেও দুই দলের প্রয়োজন ছিল আরও একটি গোলের। টেবিলের তলানির দিকে থাকা বেনফিকাকে প্লে অফ নিশ্চিত করতে হলে আরও একটি গোল করতে হতো। অন্যদিকে একটি গোল পেলে সরাসরি শেষ ষোলোর টিকিট পেয়ে যাবে রিয়ালও।
তবে শেষ মিনিটেই পাল্টে গেল পুরো দৃশ্যপট। যোগ করা সময়ের শেষ দিকে ফ্রি কিক থেকে গোলকিপার আনাতলি ত্রুবিনে গোলে ব্যবধান ৪-২ করে নেই মরিনিহোর শিষ্যরা। এ গোলটি যে শুধু রিয়ালের কফিনের শেষ পেরেক ছিল তা নয়; এই গোলে মার্শেইকে পেছনে ফেলে প্লে-অফে ওঠে বেনফিকা। আর পয়েন্ট টেবিলের ৯ নম্বরে থাকায় নকআউট ‘প্লে অফ’ খেলতে হবে রিয়ালকে।
ম্যাচে রিয়ালের হয়ে জোড়া গোল করেন কিলিয়ান এমবাপে। বেনফিকার হয়ে দুটি গোল করেন আন্দ্রেয়াস শেলদ্রুপ, একটি পেনাল্টি থেকে গোল করেন পাভলিদিস।
সব সমীকরণ মিলিয়ে শেষ আটে বার্সেলোনা
আরেক স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার জন্যও এ রাতে ছিল জটিল হিসাব। ডেনিশ ক্লাব এফসি কোপেনহেগেনের বিপক্ষে ঘরের মাঠে তাদের জয় পেলেই হতো না, বড় ব্যবধানে জয়ের পাশাপাশি অন্য ম্যাচের ফলও দরকার ছিল তাদের পক্ষে।
এমন জটিল সমীকরণ নিয়ে মাঠে নেমে শুরুর ৪ মিনিটের মধ্যেই গোল হজম করে বসে কাতালানরা। প্রথমার্ধে বলার মতো কোনো আক্রমণও করতে পারেনি রাফিনিয়া-ইয়ামালরা।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট। ম্যাচের ৪৮তম মিনিটে কোপেনহেগেনের জালে বল পাঠিয়ে ‘ডেডলক’ ভাঙেন অভিজ্ঞ লেভানডভস্কি। এরপর নিয়মিত বিরতিতে একের পর এক গোল করেন ইয়ামাল, রাফিনিয়া এবং মার্কাস রাশফোর্ড।
শেষ পর্যন্ত কোপেনহেগেনের বিপক্ষে ৪–১ গোলের জয় পাওয়ার পর অন্য ম্যাচের ফলও অনুকূলে আসায় শেষ আটে জায়গা করে নেয় কাতালানরা।
ম্যানচেস্টার সিটির স্বস্তি, লিভারপুলের বড় জয়
টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ বোডো/গ্লিমটের কাছে হেরে পয়েন্ট টেবিলে অবনতি হয়েছিল ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির। ফলে শেষ ম্যাচে গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না পেপ গার্দিওলার শিষ্যরা। আর এমন ম্যাচে ঘরের মাঠ ইতিহাদ স্টেডিয়ামে হোঁচট খায়নি সিটিজেনরা। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে জিতে সরাসরি শীর্ষ আট নিশ্চিত করেছে পেপ গার্দিওলার দল।
অন্যদিকে লিভারপুল প্রত্যাশামতোই সহজ জয় পেয়েছে কারাবাগ এফকের বিপক্ষে। অ্যানফিল্ডে ৬–০ গোলের জয় পায় অল রেডরা। ম্যাক অ্যালিস্টার দুটি গোল করেন, অন্য গোলগুলো করেন সালাহ, ভিয়েটজ, একিটিকে ও চিয়েসা। ১৮ পয়েন্ট নিয়ে লিগ পর্ব শেষ করে লিভারপুল।
প্লে-অফে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন পিএসজি
নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে জিতলেই সরাসরি শেষ ষোলো নিশ্চিত হতো পিএসজির। তবে পার্ক দে প্রিন্সেসে ১–১ গোলে ড্র হওয়ায় দুই দলকেই প্লে-অফ খেলতে হবে।
ভিতিনিয়ার গোলে এগিয়ে যায় পিএসজি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে জো উইলকের গোলে সমতা ফেরায় নিউক্যাসল। পরে দুই দলই সুযোগ পেলেও কেউই ব্যবধান গড়তে পারেনি।
‘জায়ান্ট কিলার’ বোডো/গ্লিমট
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অভিষেক মৌসুমেই ইতিহাস গড়েছে নরওয়ের ক্লাব বোডো/গ্লিমট। ম্যানচেস্টার সিটিকে হারানোর পর এবার আতলেতিকো মাদ্রিদকে ২–১ গোলে পরাজিত করে প্লে-অফ নিশ্চিত করেছে তারা। শুরুতে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পায় বোডো/গ্লিমট।
সরাসরি শেষ ষোলো (শীর্ষ আট)
আর্সেনাল, বায়ার্ন মিউনিখ, লিভারপুল, টটেনহাম, বার্সেলোনা, চেলসি, স্পোর্তিং সিপি, ম্যানচেস্টার সিটি।
নকআউট প্লে-অফে
রিয়াল মাদ্রিদ, ইন্টার মিলান, পিএসজি, নিউক্যাসল, জুভেন্টাস, আতলেতিকো মাদ্রিদ, আতালান্তা, লেভারকুসেন, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, অলিম্পিয়াকোস, ক্লাব ব্রুগা, গালাতাসারাই, মোনাকো, কারাবাগ, বোডো/গ্লিমট, বেনফিকা।
বাদ পড়লো যারা
মার্শেই, পাফোস, ইউনিয়ন সাঁ-জিলোয়াস, পিএসভি, বিলবাও, নাপোলি, কোপেনহেগেন, আয়াক্স, ফ্রাঙ্কফুর্ট, স্লাভিয়া প্রাগ, ভিয়ারিয়াল, কাইরাত আলমাতি।
আরডি